বীমা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করা নন-লাইফ বীমা সমীক্ষক ও ক্ষতিপূরণ মূল্যায়কদের গোপন তথ্যের অপব্যবহার এখন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এই পেশার জন্য বিশেষ নিয়মাবলী গৃহীত হয়েছে, যা ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর গেজেটের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে।
নতুন বিধি “ইনস্যুরেন্স সার্ভেয়ার অ্যান্ড লস অ্যাসেসর ডিউটিস, রেসপনসিবিলিটিজ অ্যান্ড কোড অফ কন্ডাক্ট রেগুলেশনস, ২০২৫” নামে পরিচিত। এই নিয়মাবলীর অধীনে সমীক্ষক ও মূল্যায়করা তাদের পেশাগত কাজের মাধ্যমে প্রাপ্ত গোপন তথ্যকে ব্যক্তিগত স্বার্থ বা তৃতীয় পক্ষের লাভের জন্য ব্যবহার বা প্রকাশ করতে পারবেন না; তথ্যের ব্যবহার সীমাবদ্ধ থাকবে কেবল বীমা কোম্পানি ও বীমা গ্রাহকের মধ্যে।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর এক কর্মকর্তা গোপনীয়তা বজায় রেখে জানিয়েছেন, ২০১০ সালের বীমা আইনেই সমীক্ষক ও ক্ষতিপূরণ মূল্যায়কদের আচরণবিধি সংক্রান্ত ধারা রয়েছে, তবে তা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত নয়। নতুন নিয়মাবলী সেই ফাঁক পূরণ করে, প্রযুক্তিগত শব্দের স্পষ্ট সংজ্ঞা ও প্রয়োগের পদ্ধতি প্রদান করে, যাতে বীমা সংস্থা ও গ্রাহক উভয়ই আইনকে সহজে বুঝতে পারে।
অধিকন্তু, আইডিআরএ উল্লেখ করেছে যে, বর্তমান সময়ে বীমা সমীক্ষকদের কাজের মান আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। এই ফাঁক পূরণ এবং সমগ্র পেশাকে একক কাঠামোর অধীনে আনতে নতুন বিধি প্রণয়ন করা হয়েছে। ফলে, সমীক্ষক ও মূল্যায়কদের কাজের গুণগত মান উন্নত হবে, এবং বীমা দাবি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়বে।
নন-লাইফ বীমা, যেমন অগ্নি, সামুদ্রিক, গাড়ি ও সম্পত্তি বীমা, এই পেশার ওপর নির্ভরশীল। যখন কোনো গ্রাহক দুর্ঘটনা বা ক্ষতির পর দাবি দায়ের করেন, তখন সমীক্ষককে ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়, ঘটনার সত্যতা যাচাই এবং ক্ষতির মাত্রা মূল্যায়ন করতে হয়। তার প্রতিবেদনই মূলত নির্ধারণ করে দাবি গৃহীত হবে কিনা এবং কত পরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, গোপন তথ্যের অপব্যবহার বন্ধের মাধ্যমে বীমা সংস্থাগুলোকে আর্থিক ক্ষতি কমাতে সহায়তা করবে। তথ্যের সুরক্ষা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পেলে গ্রাহকের আস্থা বাড়বে, যা বীমা পণ্যের চাহিদা ও বিক্রয় বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজের গুণগত মান নিশ্চিত হওয়ায় বিদেশি বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
তবে, নতুন নিয়মাবলীর বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। সমীক্ষক ও মূল্যায়কদের জন্য অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন প্রয়োজন হবে, যা স্বল্পমেয়াদে খরচ বাড়াতে পারে। এছাড়া, গোপন তথ্যের লঙ্ঘন হলে শাস্তি নির্ধারণের প্রক্রিয়া স্পষ্ট না হলে আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে। এসব বিষয় সমাধানের জন্য আইডিআরএকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সংশোধনী প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে।
সামগ্রিকভাবে, এই বিধি বীমা শিল্পের স্বচ্ছতা, গ্রাহক সুরক্ষা এবং পেশাগত মান উন্নয়নের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে, সমীক্ষক ও মূল্যায়কদের কাজের মানদণ্ড আরও কঠোর হবে, এবং তথ্যের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত সমাধান, যেমন ডিজিটাল রেকর্ড ও এনক্রিপশন, গ্রহণ করা হতে পারে। এ ধরনের উন্নয়ন বীমা বাজারের স্থিতিশীলতা ও বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে, তবে নিয়মের সঠিক প্রয়োগ ও পর্যবেক্ষণই মূল চাবিকাঠি হবে।
বীমা শিল্পের অংশীদারদের জন্য এই পরিবর্তন মানে হল, দাবি প্রক্রিয়ায় দেরি কমে যাবে, প্রতারণার ঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং গ্রাহকের সন্তুষ্টি বাড়বে। একই সঙ্গে, বীমা সংস্থাগুলোকে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে, যাতে নতুন কোড অফ কন্ডাক্টের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখা যায়। শেষ পর্যন্ত, এই বিধি বীমা বাজারকে আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।



