সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) একটি বিবৃতি জারি করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কর্মকাণ্ডকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য “লাল রেখা” হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং হুমকি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে কোনো দ্বিধা করবে না বলে জানিয়েছে। এই সতর্কবার্তা ইউএইকে সমর্থন করা দক্ষিণ-ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সামরিক সহায়তা সম্পর্কে উদ্বেগের প্রতিক্রিয়া।
বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, দেশের নিরাপত্তার জন্য যে কোনো হুমকি লাল রেখা অতিক্রম করে এবং সেই ক্ষেত্রে সৌদি আরব দ্রুত এবং দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের অধিকার সংরক্ষণ করবে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি ইউএইয়ের বিরুদ্ধে সৌদি সরকারের সর্বোচ্চ কঠোর ভাষার প্রকাশ, যা পূর্বে ইউএইকে সমর্থনকারী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা তুলে ধরে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছেন, ২৭ ও ২৮ ডিসেম্বর দু’টি ইউএই জাহাজ মুকাল্লা বন্দরে অনুমোদন ছাড়া প্রবেশ করে এবং হাদ্রামাউত ও মাহরা প্রদেশে দক্ষিণ ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (STC) বাহিনীর জন্য বিশাল পরিমাণে অস্ত্র ও যুদ্ধযান সরবরাহ করে। জোটের সামরিক কমান্ড এই জাহাজগুলোর আগমনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেনি, ফলে তা আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও জোটের নীতির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
এরপর জোটের বিমান বাহিনী আজ সকালে সীমিত আকাশীয় অভিযান চালিয়ে ঐ জাহাজগুলো থেকে নামানো অস্ত্র ও যুদ্ধযানকে লক্ষ্যবস্তু করে আঘাত হানে। এই আক্রমণকে জোটের পক্ষ থেকে “সীমিত” বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে এটি ইউএইয়ের সরবরাহ চ্যানেলকে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে ইউএইয়ের পদক্ষেপকে “অত্যন্ত বিপজ্জনক” এবং “দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, ইয়েমেন প্রজাতন্ত্র ও পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় যুক্তি দিয়েছে যে, ইউএইয়ের সমর্থনযুক্ত দক্ষিণ ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের সামরিক অভিযান হাদ্রামাউত ও আল-মাহারা প্রদেশে দেশের দক্ষিণ সীমান্তে অগ্রসর হচ্ছে, যা জোটের মূল নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই সতর্কতা সৌদি আরবের জন্য একটি কূটনৈতিক সংকেত, যা ইউএইকে তার সমর্থন পুনর্বিবেচনা করতে এবং জোটের নীতি অনুসরণে বাধ্য করতে চায়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যদি ইউএই এই লাল রেখা অতিক্রম করে, তবে সৌদি আরবের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া সামরিক সীমা বাড়ানো, বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা বা আন্তর্জাতিক ফোরামে ইউএইয়ের অবস্থান দুর্বল করার দিকে ঝুঁকতে পারে।
অঞ্চলীয় প্রেক্ষাপটে, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ বহু বছর ধরে চলমান এবং বিভিন্ন বাহ্যিক শক্তির হস্তক্ষেপে জটিলতর হয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রধান লক্ষ্য হল আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা। ইউএইয়ের সামরিক সহায়তা এই লক্ষ্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে, ফলে সৌদি আরবের কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়ছে।
পরবর্তী সময়ে, জোটের নেতৃত্বাধীন দেশগুলো ইউএইয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালিয়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন নিয়ে ইউএইকে তার নীতি পুনর্বিবেচনা করতে আহ্বান জানাবে। একই সঙ্গে, মুকাল্লা বন্দরে সম্ভাব্য অতিরিক্ত সরবরাহ রোধে জোটের নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
সৌদি আরবের এই দৃঢ় অবস্থান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের জটিল কূটনৈতিক সম্পর্কের পুনর্গঠনকে নির্দেশ করে। ভবিষ্যতে, ইউএইয়ের পদক্ষেপ এবং জোটের প্রতিক্রিয়া অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও মানবিক পরিস্থিতির উপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।



