থাইল্যান্ড সরকার ১৮ জন ক্যাম্বোডিয়ান সৈন্যকে মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করেছে, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে পুনর্নবীকৃত যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। এই সিদ্ধান্তটি ৭ই অক্টোবর (শুক্রবার) দুপুর ১২টায় (GMT+7) কার্যকর হওয়া ৭২ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি পূর্ণ হওয়ার পর নেওয়া হয়েছে। থাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নিকরন্দেজ বালাঙ্কুরা মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন যে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত মুক্তির তারিখ ও সময় নির্ধারণ করা হবে।
বিলম্বের মূল কারণ হিসেবে ক্যাম্বোডিয়ান ড্রোনের থাইল্যান্ডের আকাশে অনধিকার প্রবেশ উল্লেখ করা হয়েছে। থাই সামরিক বাহিনী সোমবারের রিপোর্টে জানায়, রবিবার রাতের দিকে ২৫০টিরও বেশি ড্রোন থাইল্যান্ডের সীমান্ত অঞ্চলে প্রবেশ করে, যা যুদ্ধবিরতির শর্তের সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ড্রোনের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য স্পষ্ট না হলেও, থাই নিরাপত্তা দপ্তর এই ঘটনাকে গুরুতর হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
নিকরন্দেজ বালাঙ্কুরা উল্লেখ করেন, “মুক্তির তারিখ ও সময় নিরাপত্তা দিক থেকে নির্ধারিত হবে” এবং তিনি যোগ করেন যে, শর্ত পূরণ হলে দ্রুত হস্তান্তর করা হতে পারে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, বর্তমান নিরাপত্তা পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, ফলে মুক্তি কখন হবে তা এখনো অনির্ধারিত।
ক্যাম্বোডিয়ান সরকারও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ক্যাম্বোডিয়ান সরকারের মুখপাত্র পেন বোনা জানান, থাইল্যান্ডের দাবির প্রতি এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি এবং তারা বিষয়টি নিবিড়ভাবে অনুসরণ করছে। উভয় পক্ষের মধ্যে এখনও কোনো সরাসরি সংলাপের খবর প্রকাশিত হয়নি।
সৈন্যদের হস্তান্তরের শর্ত ছিল, যদি যুদ্ধবিরতি নির্ধারিত ৭২ ঘণ্টা অবধি কোনো লঙ্ঘন না হয়, তবে বন্দি সৈন্যদের মুক্তি দেওয়া হবে। তবে ড্রোনের অনুপ্রবেশের পর থাইল্যান্ড এই শর্তকে পুনরায় মূল্যায়ন করেছে। বন্দি সৈন্যদের ধরার ঘটনা সাম্প্রতিক সংঘর্ষের একটি অংশ, যেখানে সীমান্তে উভয় দেশের সৈন্য একে অপরের ওপর গুলি চালায়।
এই যুদ্ধবিরতি পূর্বে ২০ দিনের তীব্র লড়াইকে থামিয়ে দিয়েছিল, যার ফলে ১০০ের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং প্রায় অর্ধ মিলিয়ন মানুষ তাদের বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে। উভয় দেশের নাগরিকদের উপর এই সংঘাতের মানবিক প্রভাব গভীর, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে মৌলিক সেবা ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে।
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার একটি আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছে, কারণ একটি থাই সৈন্যের অঙ্গ হারিয়ে গিয়েছিল একটি ভূমি-ধ্বংসক (ল্যান্ডমাইন) বিস্ফোরণে, যা সীমান্তে ঘটেছিল। ল্যান্ডমাইন ঘটনার পর এই ঘটনা যুদ্ধবিরতির পুনরায় আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে, কারণ উভয় পক্ষই এই ধরনের সন্ত্রাসী অস্ত্রের ব্যবহারকে নিষিদ্ধ বলে দাবি করে।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষের মূল কারণগুলোর মধ্যে ল্যান্ডমাইন এবং ড্রোনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। জুলাই মাসে পাঁচ দিনের তীব্র লড়াইয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়া মধ্যস্থতায় একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা এই নতুন বিরতির ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ড্রোনের অনুপ্রবেশ এবং ল্যান্ডমাইন ঘটনার পর এই সাময়িক শান্তি আবার ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
থাই পররাষ্ট্র মন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেটকেও বুধবার উল্লেখ করেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি খুবই নাজুক এবং উভয় দেশের নেতৃত্বকে উত্তেজনা বাড়াতে না দেওয়ার জন্য সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, “শান্তি বজায় রাখতে উভয় পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন, অন্যথায় সংঘাত পুনরায় তীব্র হতে পারে।” এই মন্তব্যটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে থাইল্যান্ডের কূটনৈতিক অবস্থানকে স্পষ্ট করে।
অঞ্চলীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, থাইল্যান্ড-ক্যাম্বোডিয়া সীমান্তের এই উত্তেজনা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে, বিশেষ করে আরএমএম (ASEAN) গোষ্ঠীর সংহতি ও সমন্বয়কে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন হবে, উভয় দেশের উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি আলোচনার সূচনা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তত্ত্বাবধানে যুদ্ধবিরতির শর্তের পুনর্মূল্যায়ন। যদি এই আলোচনায় অগ্রগতি না হয়, তবে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা বাড়তে পারে, যা অঞ্চলের মানবিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
সারসংক্ষেপে, থাইল্যান্ডের ক্যাম্বোডিয়ান সৈন্যদের মুক্তি বিলম্বের সিদ্ধান্ত ড্রোনের অনুপ্রবেশ এবং ল্যান্ডমাইন ঘটনার পর নিরাপত্তা উদ্বেগের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে। যুদ্ধবিরতির শর্ত পূরণ না হলে হস্তান্তর বিলম্বিত হবে, এবং উভয় দেশের কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করে পরবর্তী সময়ে শান্তি বজায় রাখা সম্ভব হবে কিনা তা নির্ধারিত হবে।



