দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫-এ মৃত্যুবরণ করেন। তার শেষকৃত্যকে স্মরণে দিনাজপুরের বালুবাড়ি গ্রাম ও শহরের দলীয় কার্যালয়ে সমবেত হয় রাজনৈতিক কর্মী, পরিবারিক আত্মীয় এবং স্থানীয় বাসিন্দা। কোরআন তেলাওয়াতের অনুষ্ঠান এবং স্মৃতিচারণের মাধ্যমে শোক প্রকাশ করা হয়।
খালেদা জিয়ার জন্মস্থান দিনাজপুরের পৌর এলাকার বালুবাড়ি গ্রাম। তার পিতা ইস্কান্দার মজুমদার ও মাতা তৈয়বা মজুমদার পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি তৃতীয় সন্তান। বাড়ির নাম তার মায়ের নাম অনুসারে ‘তৈয়বা ভিলা’। শৈশব ও কৈশোরের বেশিরভাগ সময়ই এই বাড়িতে কাটিয়েছেন, যদিও বর্তমানে সেখানে কোনো পারিবারিক সদস্য বসবাস করে না।
মৃত্যুর খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দলের নেতাকর্মীরা বালুবাড়ি গ্রামে ছুটে এসে বাড়ির সামনে এবং শহরের জেল রোডে অবস্থিত বিএনপি কার্যালয়ে সমাবেশ করেন। সেখানে কোরআন তেলাওয়াতের পর পারিবারিক স্মৃতিচারণের সেশন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে খালেদা জিয়ার আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠ কর্মীরা তার জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।
বিএনপি চেয়ারপার্সনের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আবু তাহের বালুবাড়ি বাড়িতে উপস্থিত হয়ে অতীতের স্মৃতি শেয়ার করেন। তিনি বলেন, “১৯৯১ সালে তিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দিনাজপুরে আসার সময় আমাকে ‘পটল’ বলে ডাকতেন। বিয়ের পর যখন আমি তার ক্যাম্পাসের বাড়িতে গিয়েছিলাম, সেখানে বড় কাঁঠাল ঝুলে ছিল, তিনি তা দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘দেখো, কাঁঠালটা তোর সমান হয় কি না।’”
খালেদা জিয়া দিনাজপুর মিশন স্কুলে পাঁচ বছর বয়সে শিক্ষার সূচনা করেন। ১৯৬০ সালে তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। তার শিক্ষাজীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস রচনা করেন।
বিএনপি দলের বর্তমান প্রধান শিক্ষক নাজমা ইয়াসমিন, যিনি খালেদা জিয়ার প্রাক্তন বিদ্যালয়ের প্রধান, তার মৃত্যুর শোক প্রকাশে বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া দিনাজপুরের গর্ব, দেশের গর্ব। তিনি এই বিদ্যালয়ে পড়েছেন এবং প্রথম নারী হিসেবে দেশের শীর্ষমঞ্চে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তার চলে যাওয়ায় দেশ একটি অভিভাবক হারিয়েছে।”
রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি প্রথমবারের মতো তার নিজ জন্মস্থান দিনাজপুর‑৩ (সদর) আসনে সংসদ সদস্যের প্রার্থী হন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য ২৮ ডিসেম্বর তারপরে দলীয় সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং অন্যান্য নেতাকর্মীরা তার পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেন। এই পদক্ষেপে পার্টির অভ্যন্তরে ঐক্য ও সমন্বয় দেখা যায়।
চেয়ারপার্সনের মৃত্যুর খবর শোনার পর দলীয় নেতারা পার্টির বিভাজন ভুলে একত্রিত হয়ে তার প্রতি সম্মান জানাতে একসাথে কাজ করার প্রতিজ্ঞা করেন। বিভিন্ন জেলায় তার স্মরণে আলোচনা সভা ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে পুনরায় উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বড় শূন্যতা তৈরি করেছে। তার অনুপস্থিতিতে বিএনপি কীভাবে নেতৃত্বের কাঠামো পুনর্গঠন করবে এবং আগামী নির্বাচনে তার উত্তরসূরির ভূমিকা কী হবে, তা এখন বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে। তবে পার্টির অভ্যন্তরে এখনো তার নীতি ও আদর্শের প্রতি দৃঢ় সমর্থন দেখা যাচ্ছে।
দলীয় কর্মীরা তার মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে তার পরিবারকে সহায়তা করার জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগও চালু করেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তার সন্তান ও নাতি-নাতনির জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
বিএনপি উচ্চপদস্থ নেতারা ভবিষ্যৎ নির্বাচনে তার রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে বজায় রাখার জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করছেন। বিশেষ করে দিনাজপুর-৩ আসনে তার প্রার্থী হিসেবে নতুন মুখের নাম উন্মোচিত হবে কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে পার্টি ইতিমধ্যে প্রাথমিক সমর্থন সংগ্রহে লিপ্ত।
সারসংক্ষেপে, খালেদা জিয়ার মৃত্যু দেশজুড়ে শোকের ছায়া ফেলেছে, তার জন্মস্থলে এবং পার্টি কার্যালয়ে সমবেত হয়ে মানুষ তার জীবন ও কর্মকে স্মরণ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তার অনুপস্থিতিতে পার্টির অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও নির্বাচনী কৌশলকে মূল দিক হিসেবে দেখছেন, যা দেশের রাজনৈতিক গতিপথে প্রভাব ফেলবে।



