ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার জানিয়েছে যে কানাডার রয়্যাল কানাডিয়ান নেভি (RCN)কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই পদক্ষেপটি কানাডা ১৯ জুন ২০২৪ তারিখে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার প্রতিক্রিয়া হিসেবে নেওয়া হয়েছে। ইরান এই সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী বলে সমালোচনা করেছে।
ইরানের বিবৃতি অনুযায়ী, পারস্পরিকতা নীতির আওতায় কানাডি নৌবাহিনীর ওপর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যদিও রায়ের ফলে কানাডার নৌবাহিনীর কার্যক্রমে কী ধরনের প্রভাব পড়বে তা স্পষ্ট করা হয়নি। ইরান জোর দিয়ে বলেছে যে, কোনো রাষ্ট্রের সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার ভিত্তি হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া।
কানাডা ১৯ জুন ২০২৪ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে IRGC-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে, ফলে IRGC সদস্যদের কানাডায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং তাদের সঙ্গে কোনো আর্থিক লেনদেন অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। এছাড়া, কানাডা আইনের অধীনে IRGC বা তার সদস্যদের কানাডায় থাকা সম্পদ জব্দের বিধানও কার্যকর করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে তেহরান থেকে উড়ে যাওয়া পিএস৭৫২ ফ্লাইটের ধ্বংসের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। ঐ দুর্ঘটনায় ১৭৬ জন যাত্রী ও ক্রু নিহত হয়, যার মধ্যে ৮৫ জন কানাডার নাগরিক ও স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন।
IRGC পরে স্বীকার করে যে তাদের বাহিনীই বিমানটি ধ্বংস করেছে, তবে তারা দাবি করে যে নিয়ন্ত্রণকারী কর্মীরা ভুলবশত বিমানটিকে শত্রু লক্ষ্যবস্তু হিসেবে শনাক্ত করেছিল। এই ব্যাখ্যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত হয়নি।
কানাডা ২০১২ সালে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং ইরানকে “বিশ্ব শান্তির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি” বলে উল্লেখ করে। সেই সময় থেকে দুই দেশের সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে উত্তেজনাপূর্ণ রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে IRGC-কে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে, এবং অস্ট্রেলিয়া গত মাসে একই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এই আন্তর্জাতিক সমন্বয় ইরানের নিরাপত্তা নীতি ও আঞ্চলিক প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করে।
আইনি বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ জব্দের ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বৈধ হতে পারে, তবে তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ইরানের রায়কে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করলে কূটনৈতিক বিরোধ আরও তীব্র হতে পারে।
কানাডার নৌবাহিনীর ওপর এই ঘোষণার ফলে রয়্যাল কানাডিয়ান নেভির আন্তর্জাতিক সমুদ্রভ্রমণ, যৌথ প্রশিক্ষণ ও বহুপাক্ষিক সামরিক মহড়া সীমিত হতে পারে। বিশেষ করে ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় ও শিপিং রুটে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন হতে পারে।
অঞ্চলীয় নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে, ইরানের এই পদক্ষেপ পারস্য উপসাগরে ইতিমধ্যে জটিল ভূ-রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতিকে আরও জটিল করে তুলবে। ইরানের সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার ফলে পারস্যের জাহাজ চলাচল, তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুটে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
দুই দেশের মধ্যে এই টিট-ফর-ট্যাটের পরিণতি আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশেষ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনার বিষয় হতে পারে। ভবিষ্যতে সম্ভাব্য কূটনৈতিক মিটিং ও মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা উভয় পক্ষের আইনগত অবস্থান স্পষ্ট করতে সহায়তা করতে পারে।
কানাডা ও ইরানের এই পারস্পরিক সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও সামরিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে। উভয় দেশের কূটনীতিকদের জন্য এখনই সংলাপের পথ খোঁজা এবং আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে সমাধান খুঁজে বের করা জরুরি, যাতে সংঘাতের মাত্রা বাড়ে না।



