খালেদা জিয়া, যিনি বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন, তার রাজনৈতিক পদচারণা এখন ফেনি-১ থেকে দিনাজপুর-৩ (সদর) পর্যন্ত বিস্তৃত হতে চলেছে। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্ম নেওয়া জিয়ার জন্মের সময় পরিবারে আনন্দের স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে ছিল; তার নাম তার বাবার বন্ধুর, ডাঃ অবনী গুহের প্রস্তাবিত ‘শান্তি’ নামে রাখা হয়।
বাবা ইস্কান্দার মজুমদারের কর্মস্থল পরিবর্তনের ফলে জিয়ার শৈশব দিনাজপুরে কেটেছে, যদিও তার পৈতৃক নিবাস ফেনীর ফুলগাজীর শ্রীপুর গ্রামে, যা স্থানীয়ভাবে ‘মজুমদার বাড়ি’ নামে পরিচিত। শিক্ষাজীবনও একই শহরে শুরু হয় এবং ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
বিবাহের সময় জিয়াউর রহমান দিনাজপুরে ডিএফআই (বর্তমান ডিজিএফআই) কর্মকর্তা ছিলেন; ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর তিনি করাচিতে বদলি হন, ফলে জিয়া ও তার স্বামী সেখানে একত্রে বসবাস করেন। ১৯৭০ সালে জিয়াউর রহমানকে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি করা হয় এবং তিনি চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকায় বসতি স্থাপন করেন, যেখানে দুই সন্তান—তারেক এবং আরাফাত—জন্ম নেয়। ঐ বাসা ১৯৭১ সালের মার্চের উত্তাল ঘটনায় সরাসরি সাক্ষী হয়।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া ১৯৯৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত চারবার ফেনি-১ আসন থেকে নির্বাচিত হন এবং ধারাবাহিকভাবে সংসদে তার উপস্থিতি বজায় রাখেন। এখন তিনি প্রথমবারের মতো দিনাজপুর-৩ (সদর) আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যা তার রাজনৈতিক পরিধি উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শামসুল আলম সেলিমের মতে, জিয়া রাজনৈতিক ও পারিবারিক বাধা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার ছাপ রেখে গেছেন এবং তার অদম্য স্বভাব তাকে বিশেষ করে তুলেছে। একই সঙ্গে শৌকত আলী খান রচিত ‘জিয়াউর রহমান: একটি রাজনৈতিক মহাকাব্য’ গ্রন্থে জিয়াউর রহমানের ক্যারিয়ার ও তার সঙ্গে জিয়ার পারস্পরিক সমর্থনকে বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র’ গ্রন্থের নবম খণ্ডে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের উল্লেখ রয়েছে, যা ঐ সময়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে স্পষ্ট করে। এই তথ্যগুলো জিয়ার পারিবারিক বাসার ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও উজ্জ্বল করে।
খালেদা জিয়া যখনই রাজনৈতিক মঞ্চে ফিরে আসেন, তিনি তার পৈতৃক গৃহের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখেন। ফেনীর শ্রীপুর গ্রামে তার আত্মীয়-স্বজন এখনও বসবাস করেন এবং তার জন্মভূমি তার জন্য একটি মানসিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং পারিবারিক ইতিহাসের এই সমন্বয় তাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সমর্থক গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর-৩ (সদর) আসন থেকে জিয়ার প্রথমবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তার জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে তার বিস্তৃত অভিজ্ঞতার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। তার এই পদক্ষেপের ফলে ফেনি ও দিনাজপুরের ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক গতিবিধি কীভাবে পরিবর্তিত হবে তা দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজরে থাকবে।
খালেদা জিয়ার দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক কার্যক্রম এবং তার স্বামী জিয়াউর রহমানের সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত জীবনকথা, উভয়ই বাংলাদেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ গঠন করে। তার ভবিষ্যৎ নির্বাচনী পরিকল্পনা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন গতিবিধি আনতে পারে এবং তার অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য উদাহরণস্বরূপ কাজ করবে।



