খালেদা জিয়া, যিনি ১৯৮৪ সালে বিএনপি চেয়ারপার্সন হিসেবে নিযুক্ত হন, গত মে মাসে তার দায়িত্বের ৪১ বছর পূর্ণ করেছেন। জিয়া, যিনি জিয়াউর রহমানের হত্যার পর রাজনৈতিক মঞ্চে প্রবেশ করেন, দুই বছর অল্প সময়ের মধ্যেই দলের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হন এবং একই বছরের মে মাসে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়াই চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন।
বিএনপি তার নেতৃত্বে তিনবার সরকারে ফিরে আসে: ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জিয়া দু’বার প্রধানমন্ত্রী এবং একবার পার্লামেন্টের প্রধান নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার শাসনামলে দলটি দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা গঠন করে এবং বহু নীতি বাস্তবায়ন করে।
১৯৯১ সালে জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন, যা তাকে মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী শীর্ষ সরকারপ্রধানের মর্যাদা এনে দেয়। নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে তার অবদান স্বীকৃত হয়ে ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনে বিশ্বের সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন নারীদের তালিকায় ২৯ নম্বরে স্থান পায়।
অবশ্যই, জিয়ার রাজনৈতিক জীবন সবসময় মসৃণ ছিল না। আওয়ামী লীগ শাসনামলে তার বিরুদ্ধে দুটি মামলায় দণ্ডাদেশ দেওয়া হয় এবং দুই বছরের বেশি সময় কারাবন্দী রাখা হয়। ২০২০ সালের মার্চে কোভিড-১৯ মহামারির সময় সরকার এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তার শাস্তি স্থগিত করে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয়। পরবর্তীতে আবেদনপত্রের ভিত্তিতে শাস্তি পুনরায় স্থগিত করা হয় এবং মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পরপরই, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট সরকার আরেকটি নির্বাহী আদেশ জারি করে জিয়াকে মুক্তি দেয়। মুক্তির পর তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য ২০২৫ সালে হাসপাতালে ভর্তি হন, যা দেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
বিএনপি-র অভ্যন্তরে জিয়ার নেতৃত্বকে ‘ক্যারিশম্যাটিক’ বলা হয় এবং তিনি স্বীকার করেন যে তিনি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি পার্টির ভিত্তি শক্তিশালী করতে এবং সমর্থকদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখতে সহায়তা করেছে।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকার জিয়ার বিরুদ্ধে নেওয়া আইনি পদক্ষেপগুলোকে দেশের আইনি শাসন ও ন্যায়বিচার রক্ষার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে। সরকার দাবি করে যে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই আইনসম্মতভাবে দায়বদ্ধ, এবং জিয়ার শাস্তি তার রাজনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রযোজ্য।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জিয়ার দীর্ঘমেয়াদী নেতৃত্বের প্রভাব স্পষ্ট। তার অবসরের সম্ভাবনা, পার্টির নতুন নেতৃত্বের নির্বাচন এবং পার্টির অভ্যন্তরীণ গঠন পরিবর্তন দেশের রাজনৈতিক গতিপথে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে, যদি জিয়া পার্টির অভ্যন্তরে নতুন মুখকে সমর্থন করেন, তবে তা বিএনপি-কে পুনরায় শক্তিশালী করে নির্বাচনী মঞ্চে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে পারে।
অন্যদিকে, সরকার জিয়ার স্বাস্থ্য অবস্থা এবং তার রাজনৈতিক কার্যক্রমের উপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে পারে, যা পার্টির কৌশলগত পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলবে। জিয়ার স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার এবং তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা দেশের রাজনৈতিক সমতা ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সারসংক্ষেপে, খালেদা জিয়ার ৪১ বছরের চেয়ারপার্সন মেয়াদ তার রাজনৈতিক জীবনের উত্থান-পতনের সাক্ষী। তিনি তিনবার সরকারের শীর্ষে ছিলেন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন এবং আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। তার ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ এবং পার্টির নেতৃত্বের পরিবর্তন দেশের রাজনীতিতে নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করতে পারে, যা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করবে।



