মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৯ ডিসেম্বর ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে সাংবাদিকদের সামনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ব্যক্তিগত বাসভবনে ইউক্রেনীয় ড্রোন আক্রমণের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ট্রাম্পের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের সমাপ্তি নিয়ে চলমান শান্তি আলোচনার সময়ে এমন আক্রমণ করা “সঠিক সময় নয়” এবং এটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের ভিত্তি ছিল পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনিক আলাপ, যেখানে রাশিয়ার নেতা সরাসরি তাকে আক্রমণের তথ্য জানিয়েছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন, “এই খবরটি আমাকে পুতিন নিজে দিয়েছেন,” এবং জোর দিয়ে বলেন যে কোনো পক্ষের আক্রমণাত্মক কাজের প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক, তবে ব্যক্তিগত বাসভবনে আক্রমণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা। বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন উসকানিমূলক পদক্ষেপ শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য কোনো সহায়তা নয়, তিনি কিয়েভকে সতর্ক করেন।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ একই দিনে একটি বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন যে ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলো রাশিয়ার নভগোরোদ অঞ্চলে আক্রমণ চালিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, রাশিয়ার এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম দ্রুত হস্তক্ষেপের ফলে কোনো বড় ক্ষতি বা প্রাণহানি ঘটেনি। তবে রাশিয়া ইতিমধ্যে পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, এবং ক্রেমলিনের সূত্রে এই ঘটনার ব্যাখ্যা পুতিনের ওপর হত্যার প্রচেষ্টা হিসেবে করা হয়েছে, যা দুই দেশের উত্তেজনাকে নতুন স্তরে নিয়ে গেছে।
ইউক্রেনের দিক থেকে রাশিয়ার এই অভিযোগকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। মার-এ-লাগোতে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি জানান, রাশিয়ার দাবি ভিত্তিহীন এবং কূটনৈতিক প্রচারণা মাত্র, যা শান্তি আলোচনায় মস্কোর স্বার্থসিদ্ধির জন্য করা হয়েছে। জেলেনস্কি জোর দিয়ে বলেন, রাশিয়া এমন দাবির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনের চেষ্টা করছে, তবে বাস্তবে তা কোনো বাস্তবতা বহন করে না।
বিশ্লেষকরা এই ঘটনার প্রভাবকে দুই দিক থেকে ব্যাখ্যা করছেন। ইউরোপীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অ্যানা পেট্রোভা উল্লেখ করেন, “ড্রোন আক্রমণ এবং তার পরবর্তী কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের গতি পরিবর্তন করতে পারে, বিশেষত যখন দু’পক্ষই শান্তি আলোচনার জন্য আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, রাশিয়ার পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি NATO-কে সতর্ক করতে পারে এবং অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক বিশ্লেষক জেমস হ্যান্টার যুক্তি দেন, “ট্রাম্পের মন্তব্য রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিলতা প্রকাশ করে। যদিও ট্রাম্প রাশিয়ার আক্রমণকে নিন্দা করেছেন, তবু তার রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পদ্ধতি ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সমঝোতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।” তিনি যোগ করেন, ট্রাম্পের এই প্রকাশনা ইউক্রেনকে সতর্ক করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কূটনৈতিক অবস্থানকে পুনর্বিবেচনা করার ইঙ্গিত দেয়।
এই ঘটনার পরবর্তী ধাপগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজরে রয়েছে। রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, শীতের শেষের দিকে সম্ভাব্য শীর্ষ সম্মেলন এবং ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া এই সময়ে নির্ধারিত হবে। রাশিয়ার পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি এবং ড্রোন আক্রমণের পুনরাবৃত্তি NATO-কে পূর্ব ইউরোপে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে প্ররোচিত করতে পারে, যা আবার নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করবে।
সামগ্রিকভাবে, পুতিনের বাসভবনে ড্রোন আক্রমণ এবং ট্রাম্পের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের বর্তমান পর্যায়ে একটি নতুন জটিলতা যোগ করেছে। উভয় পক্ষের কূটনৈতিক পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে। শান্তি আলোচনার সময়সূচি, নিরাপত্তা গ্যারান্টি এবং সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের সমন্বয়ই এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।



