বাংলাদেশ ব্যাংক শিল্পের কাঁচামাল, কৃষি উপকরণ ও সারের আমদানি ক্ষেত্রে দেরি মূল্য পরিশোধের সুবিধা বাড়িয়ে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রযোজ্য করেছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, অনুমোদিত ডিলারদের কাছে প্রেরিত সার্কুলার অনুযায়ী, আমদানিকৃত পণ্যের জন্য ২৭০ দিনের পরই লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) চালু করা যাবে, শর্ত হল বিক্রেতা এই সময়ের মধ্যে পেমেন্ট গ্রহণ করবে।
এই পরিবর্তনটি পূর্বে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৩৬০ দিনের জন্য কার্যকর থাকা সুবিধার তুলনায় উল্লেখযোগ্য হ্রাস ঘটায়। পূর্বের নিয়মে আমদানিকৃত পণ্যের জন্য এক বছরের কাছাকাছি সময়ে পেমেন্টের ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল, যা কিছু বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কৃষি সংস্থার জন্য আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছিল।
নতুন নির্দেশিকায় ব্যবহারের মেয়াদ নির্ধারিত হয়েছে সর্বোচ্চ ২৭০ দিন অথবা গ্রাহকের ক্যাশ কনভার্শন সাইকেল, যেটি কম হবে। অর্থাৎ, যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের নগদ রূপান্তর চক্র ২০০ দিন হয়, তবে সে ২০০ দিনের মধ্যে পেমেন্ট সম্পন্ন করতে হবে। এই শর্তটি নগদ প্রবাহের বাস্তবিক পর্যবেক্ষণকে গুরুত্ব দেয় এবং অতিরিক্ত ক্রেডিট ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
শিল্পক্ষেত্রে এই পরিবর্তন সরাসরি কাজের মূলধন ব্যবস্থাপনা প্রভাবিত করবে। কাঁচামালের আমদানি দেরি করে পেমেন্ট করা হলে উৎপাদন পরিকল্পনা আরও নমনীয় হবে এবং তহবিলের চাপ কমবে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঋণ গ্রহণের প্রয়োজন হ্রাস পাবে, ফলে ব্যাঙ্কের ঋণ পোর্টফোলিওতে চাপ কমে যাবে।
কৃষি সেক্টরে সার, কীটনাশক ও বীজের মতো মৌলিক উপকরণের আমদানি দেরি মূল্য পরিশোধের সুবিধা বজায় রাখার ফলে চাষী ও কৃষি সংস্থার নগদ প্রবাহে স্বস্তি আসবে। ফসলের মৌসুমের আগে প্রয়োজনীয় ইনপুট সুরক্ষিত করতে পারা এবং পেমেন্টের সময়সীমা বাড়িয়ে দেওয়া উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়ক হবে। তবে ক্যাশ কনভার্শন সাইকেল যদি স্বল্প হয়, তবে কৃষি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত পেমেন্ট করতে হবে, যা নগদ প্রবাহের পরিকল্পনা প্রয়োজনীয় করে তুলবে।
ব্যাংক ও অনুমোদিত ডিলারদের জন্য এই নীতি পরিবর্তন নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। দীর্ঘমেয়াদী পেমেন্টের সময়সীমা হ্রাস পেলে তাদের লিকুইডিটি অবস্থান উন্নত হবে, তবে একই সঙ্গে গ্রাহকের ক্যাশ কনভার্শন সাইকেল অনুযায়ী পেমেন্ট সংগ্রহের জন্য তীব্র মনিটরিং প্রয়োজন হবে। ব্যাঙ্কের রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমকে এই নতুন শর্তে মানিয়ে নিতে হবে, যাতে ডিফল্টের ঝুঁকি কমে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, দেরি মূল্য পরিশোধের মেয়াদ কমে যাওয়া আমদানিকৃত পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বল্পমেয়াদী চাপ কমাতে পারে, তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পণ্যের দাম বাড়লে আমদানিকর্তা অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে পারে। তাই, এই নীতি বাস্তবায়নের সময় বৈশ্বিক পণ্যের মূল্য প্রবণতা ও মুদ্রা রেটের ওঠানামা পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা শিল্প ও কৃষি খাতে নগদ প্রবাহের স্বচ্ছতা বাড়িয়ে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রাখে। তবে সুবিধার মেয়াদ কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ক্যাশ কনভার্শন সাইকেল সঠিকভাবে গণনা করে পেমেন্ট পরিকল্পনা করতে হবে। ভবিষ্যতে যদি এই নীতি ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ হয়, তবে দেশীয় উৎপাদন ও কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেতে পারে, তবে একই সঙ্গে ব্যাঙ্কের ক্রেডিট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও বাজারের মূল্য অস্থিরতা পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকবে।



