বহু তৃতীয় বিশ্বের দেশে রাজনৈতিক সহনশীলতার অভাব গড়ে উঠেছে, ফলে ক্ষমতার পরিবর্তন প্রায়শই হিংসাত্মক রূপ নেয়। নির্বাচনের আগে ও পরে রাজনৈতিক পরিবেশে উত্তেজনা বাড়ে, শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের সুযোগ কমে যায়। এই পরিস্থিতি স্বৈরতন্ত্রের উত্থান এবং বারংবার বিপ্লবের দিকে ধাবিত করে, যার ফলে বহু প্রাণহানি ঘটে।
নির্বাচনী সময়ে দলীয় সংঘর্ষ তীব্র হয়, এবং ফলাফল প্রকাশের পর বিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে সহিংসতা বাড়ে। সরকারী কাঠামোতে পরিবর্তন আনা কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে ক্ষমতা এক হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। এই প্রক্রিয়ায় স্বৈরাচারী শাসনের পথ প্রশস্ত হয়, যা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ন করে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে, ক্ষমতার পরিবর্তনের পর পুনরায় স্বৈরতন্ত্রের উত্থান দেখা যায়, যা আবার নতুন বিদ্রোহের জন্ম দেয়। এই চক্রে বহু বেসামরিক নাগরিকের প্রাণহানি ঘটে, এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়ে। তবে রাজনৈতিক নেতারা প্রায়শই এই ঘটনার থেকে শিক্ষা গ্রহণে ব্যর্থ হন, ফলে একই ধরণের অস্থিরতা পুনরাবৃত্তি হয়।
ইঁদুরের গল্পে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার সাহসিক কাজটি ঝুঁকিপূর্ণ বলে কেউ এগিয়ে আসে না, এটাই আজকের উন্নয়নশীল দেশের রাজনীতিতে দেখা যায়। কোনো নেতা যদি ঝুঁকি নিতে চায়, তবে তা প্রায়শই ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়। এই দৃষ্টান্তটি রাজনৈতিক পরিবেশে সাহসী পদক্ষেপের অভাবকে তুলে ধরে।
নেতা ও রাষ্ট্রনায়কের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট। নেতা সাধারণত নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে এবং স্বল্পমেয়াদী জনপ্রিয়তা অর্জন করে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রনায়ক দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় স্বার্থ ও বৃহত্তর জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেন। তিনি দলীয় স্বার্থের উপরে উঠে একতা ও পুনর্গঠনকে উৎসাহিত করে, দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে নিজেকে নিবেদিত করেন।
দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক কেবল নীতি নির্ধারণে নয়, জনগণের মানসিক ও নৈতিক গঠনেও ভূমিকা রাখেন। তিনি শিক্ষার মাধ্যমে জনমনের জ্ঞান বৃদ্ধি করেন এবং চরিত্র গঠনে সহায়তা করেন। দার্শনিক প্লেটোর মতে, এমন নেতা জনগণকে শিক্ষিত করার পাশাপাশি তাদের চরিত্র গঠনে অবদান রাখেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকা কেবল শাসন নয়, সমাজের নৈতিক ভিত্তি গড়তেও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নয়নশীল দেশে যদি রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি পায়, তবে রাষ্ট্রনায়কের উপস্থিতি অপরিহার্য। তিনি সংহতি ও সমঝোতার মাধ্যমে সংঘাতের সমাধান সহজ করতে পারেন। বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রনায়কের ঘাটতি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে তীব্র করে তুলছে।
রাজনীতিবিদদের যদি সহনশীলতা ও ধৈর্যের মডেল অনুসরণ করা হয়, তবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সম্মানজনক রাজনীতির সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। অন্যথায়, ঘৃণা ও প্রতিহিংসার চক্র নতুন প্রজন্মকে প্রভাবিত করে, যা সামাজিক অস্থিরতা বাড়ায়। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সহনশীলতার শিক্ষা অপরিহার্য।
যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে দেশীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা ব্যাহত হবে, এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও প্রভাব পড়বে। পুনরায় স্বৈরতন্ত্রের উত্থান বা ক্রমাগত অস্থিরতা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করবে।
অতএব, রাজনৈতিক পরিবেশে সহনশীলতা ও সংহতির গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে, রাষ্ট্রনায়কের গঠন ও প্রশিক্ষণে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের পদক্ষেপ দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।



