খালেদা জিয়া, বাংলাদেশে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন, ১৯৮২ সালে রাজনীতিতে প্রবেশের পর থেকে দেশের শাসনব্যবস্থার বিরোধে অবিচল অবস্থান বজায় রেখেছেন। তিনি জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসেবে গণমাধ্যমে “আপসহীন নেত্রী” উপাধি পেয়েছেন এবং দল‑মত নির্বিশেষে বিস্তৃত শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন।
১৯৮২ সালে তিনি রাজনৈতিক মঞ্চে পদার্পণ করেন, তখনকার প্রেসিডেন্ট হোসেন মুহাম্মদ এরশাদের বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে তার জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই সময়ে তিনি বহুবার গ্রেফতার হন, তবে দেশের স্বার্থে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প কখনো নষ্ট হয়নি।
এরশাদের শাসনকালে তিনি একাধিকবার কারাবাসে কাটিয়ে দেন এবং একবার সরকার তাকে দেশের বাইরে যাওয়ার চাপ দিয়েও তিনি দেশ ত্যাগ করেননি। শেষ পর্যন্ত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে টানা সাত বছর কারাগারে কাটাতে বাধ্য হন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর, দুই সন্তানসহ তিনি ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন। একই সময়ে বিএনপি নেতৃত্বের গঠন নিয়ে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছিল, ফলে ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি প্রাথমিক সদস্য হিসেবে দলটিতে যোগ দেন।
দলীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ করে এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন চালান। কোনো সমঝোতা ছাড়াই জনগণের অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে তিনি সংগ্রাম চালিয়ে যান, যা শেষ পর্যন্ত ১৯৮৭ সালে এক ধাপের আন্দোলন হিসেবে রূপ নেয় এবং এরশাদের পতনে ত্বরান্বিত হয়।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, এবং খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন। এই জয় তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শীর্ষে পৌঁছানোর সূচনা করে।
পরবর্তী সময়ে তিনি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এবং ২০০১ সালে জোটগতভাবে নির্বাচিত হয়ে দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন। পাশাপাশি তিনি দুবার বিএনপি চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা তাকে পার্টির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের অবস্থানে রাখে।
তার নির্বাচনী রেকর্ডও অনন্য; পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে মোট ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবগুলোতে জয়লাভ করেছেন, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অদ্বিতীয় সাফল্য হিসেবে স্বীকৃত।
২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সেনাসমর্থিত এক-ইলেভেন সরকারের তত্ত্বাবধায়ক সময়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ কারাবাসের পর সব মামলায় জামিন পান এবং কারাগারে থাকাকালীন বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দেশ ত্যাগ করেননি।
২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। তিনি ২৮ বছর ধরে যে বাড়িতে বসবাস করছিলেন, তা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার দ্বারা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তার নামে বরাদ্দ করা হয়েছিল।
বর্তমান সময়ে তিনি রাজনৈতিক মঞ্চে সক্রিয় উপস্থিতি বজায় রেখেছেন, যদিও স্বাস্থ্যগত সমস্যার কথা জানানো হয়েছে। তার নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ গঠন ভবিষ্যৎ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে যখন দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
বিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, সরকার তার বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপগুলোকে আইনগত ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তবে সমালোচকরা এটিকে রাজনৈতিক দমন হিসেবে উল্লেখ করে। এই দ্বন্দ্বের ফলস্বরূপ দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আরও জটিল হয়ে উঠেছে, যা পরবর্তী নির্বাচনী চক্রে কী প্রভাব ফেলবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।



