অন্তর্বর্তী সরকার আগস্ট ২০২৩-এ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে ধারাবাহিক চাপের মুখে রয়েছে। শীর্ষে স্পষ্ট নেতৃত্বের অভাব, কর্মকর্তাদের স্থানান্তর ও পদোন্নতির তীব্র চাহিদা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধীরগতি এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত। সরকার এই পরিস্থিতি সামাল দিতে একাধিকবার প্রচুর সংখ্যক পদোন্নতি ও স্থানান্তর অনুমোদন করেছে, যা প্রশাসনিক কাঠামোর অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলেছে।
আগস্ট ২০২৩-এ সরকার পরিবর্তনের পর সেক্রেটারিয়েটের কাজকর্মে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। পেশাগত গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন দাবি তুলে ধরে, যা প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এই সময়ে কোনো পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন উপদেষ্টা নিযুক্ত না থাকায় নীতি নির্ধারণে দিকনির্দেশের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকালে কর্মকর্তাদের স্থানান্তর ও পদোন্নতির জন্য অবিরাম আবেদন জমা হয়। এই চাহিদা পূরণে সরকার একাধিকবার বড় পরিসরে পদোন্নতি ও স্থানান্তর অনুমোদন করে, যা স্বল্প সময়ের মধ্যে বিশাল সংখ্যক কর্মকর্তাকে উচ্চ পদে উন্নীত করে। ফলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু হয়।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার পূর্ণ ক্ষমতা না থাকলে সমস্যার তীব্রতা বাড়ে। শীর্ষে স্পষ্ট দায়িত্বের অভাবের ফলে ব্যুরোক্রেটিক জট বাড়ে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হয়। এই পরিস্থিতি সরকারকে এমন একটি অবস্থায় ফেলেছে, যেখানে তার নীতি বাস্তবায়ন ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে।
প্রাক্তন সেক্রেটারি ও লেখক আবদুল আওয়াল মজুমদারও এই বিশৃঙ্খলার ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের কাজকর্মে সংস্কারমুখী সরকারের চিহ্ন দেখা যায় না; বরং প্রধানত স্থানান্তর ও পোস্টিংয়ের ওপরই মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হয়েছে, যা যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি। এই মন্তব্যগুলো বর্তমান প্রশাসনিক অস্থিরতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৩ থেকে অক্টোবর ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় ১,৭০০ জন কর্মকর্তা ডেপুটি সেক্রেটারি, জয়েন্ট সেক্রেটারি ও অতিরিক্ত সেক্রেটারির পদে উন্নীত হয়েছে। এই সংখ্যাটি স্বল্প সময়ের মধ্যে এত বড় পদোন্নতি হওয়া অস্বাভাবিক বলে বিবেচিত।
এছাড়াও, ৮৪২ জন অবসরপ্রাপ্ত ক্যাডার কর্মকর্তাকে পেছনের সময়ে পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭৬৪ জন প্রশাসন ক্যাডার থেকে। এই পেছনের পদোন্নতি প্রক্রিয়া প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে অতিরিক্ত জট সৃষ্টি করেছে।
বছরের শেষ ত্রৈমাসিকে ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) পোস্টিং নিয়ে বিভ্রান্তি ও সন্দেহ দেখা দেয়। জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে, সরকার ৫০টিরও বেশি জেলায় তিনটি পর্যায়ে নতুন ডিসি নিয়োগ করে। তবে নতুন দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের কম সময়ে কিছু ডিসি পুনর্বিন্যাস করা হয়, যা পোস্টিং প্রক্রিয়ার অস্থিতিশীলতা প্রকাশ করে।
এই পুনর্বিন্যাসের পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনা ও নির্বাচনী কৌশল কাজ করেছে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করেন। তবে সরকার এখনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি, ফলে প্রশাসনিক কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
অবস্থার ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে সরকারি নীতি বাস্তবায়ন ও জনসেবা প্রদানকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতি ও স্থানান্তর নিয়ে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো যদি স্বচ্ছ না থাকে, তবে প্রশাসনিক দক্ষতা ও জনবিশ্বাসে ক্ষতি হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে নেতৃত্বের শূন্যতা, অতিরিক্ত পদোন্নতি, এবং পোস্টিংয়ের অস্থিরতা একত্রে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সরকারকে এখন এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য স্পষ্ট নীতি ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োগ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।



