২০২৫ সালে দেশের বহিরাগত আর্থিক সূচকগুলো উন্নতি দেখালেও ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ স্থবির রইল। রেকর্ড রেমিট্যান্স প্রবাহ, স্থিতিশীল বৈদেশিক মুদ্রা বাজার এবং বাড়তি ডলার মজুদ দেশের বহিরাগত ভারসাম্যকে স্বস্তি দিলো, তবে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও শিল্পখাতে ইতিবাচক পরিবর্তন ধীরগতিতে ঘটল।
বহিরাগত দিক থেকে বছরের শুরুতে মুদ্রা বাজারের স্থিতিশীলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রেমিট্যান্সের প্রবাহে ঐতিহাসিক উচ্চতা অর্জিত হয়, যা ব্যাংকিং সিস্টেমের তরলতা বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারের চাপ কমিয়ে দেয়। মার্চ মাসে একক মাসে রেমিট্যান্স $৩.২৯ বিলিয়ন পৌঁছায়, যা পূর্বের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়।
মোঃ হাটেম, বাংলাদেশ নিটওয়্যার নির্মাতা ও রপ্তানিকারক সমিতি (BKMEA) সভাপতি, উল্লেখ করেন যে, মধ্যবর্তী সরকার বড় আকারের ঋণ জালিয়াতি বন্ধ করা এবং ডলার ঘাটতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে ব্যাংকিং খাতে অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহের ঘাটতি কিছুটা কমেছে।
অন্যদিকে, বাণিজ্য ও ব্যবসা পরিবেশের সূচকগুলো তেমন উন্নতি দেখায়নি। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইন ও শৃঙ্খলার দুর্বলতা এবং উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগকারীর আস্থা ক্ষয় করেছে। বিশেষ করে, আগস্টে গৃহযুদ্ধের পর গঠিত মধ্যবর্তী সরকারকে আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থতা অন্যতম প্রধান সমালোচনা হিসেবে উঠে এসেছে।
মাসিক রেমিট্যান্সের উত্থান দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্স $৩০.০৪ বিলিয়ন রেকর্ডে পৌঁছায়, যা পূর্ববছরের $২৩.৭৪ বিলিয়নের তুলনায় ২৫.৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই বৃদ্ধি বিদেশি মুদ্রা প্রবাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করেছে এবং ব্যাংকিং খাতে তরলতা বাড়িয়ে ঋণগ্রহীতাদের জন্য ঋণ সাশ্রয়ী করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
রেমিট্যান্সের বৃদ্ধির পেছনে বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের দেশপ্রেমের উত্সাহ এবং হুন্ডি ও হাওয়ালার মতো অবৈধ মুদ্রা স্থানান্তর চ্যানেলের হ্রাস উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। সরকার এই অবৈধ চ্যানেলগুলোকে দমন করার জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে বৈধ রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ে।
মে মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা প্রয়োগ করে, যা মুদ্রা বাজারে স্বচ্ছতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছিল। তবে, বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে ডলার মজুদের ধারাবাহিক বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্সের প্রবাহের কারণে সামগ্রিকভাবে মুদ্রা হার স্থিতিশীল রয়ে গিয়েছে।
সারসংক্ষেপে, ২০২৫ সালে বহিরাগত আর্থিক সূচকগুলো উন্নতি সত্ত্বেও দেশীয় ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইন শৃঙ্খলার ঘাটতি এবং উচ্চ সুদের হার প্রধান বাধা হিসেবে রয়ে গিয়েছে। রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক বৃদ্ধি এবং ডলার মজুদের সঞ্চয় বৈদেশিক মুদ্রা বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করলেও, অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ দূর না হওয়া পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থায়ী হবে না। ভবিষ্যতে আইন শৃঙ্খলা শক্তিশালী করা, সুদের হার হ্রাস এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রভাব ব্যবসা খাতে বিস্তৃতভাবে পৌঁছাতে পারে।



