ঢাকার কারওয়ান বাজারে পরিকল্পিত ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের জন্য ২০১৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী পরিষদ অনুমোদন দেয়। প্রকল্পের মোট বাজেট প্রায় ৯৫০ কোটি ৩৯ লাখ ৫৩ হাজার টাকা নির্ধারিত হয় এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), বাংলাদেশ সরকার ও ডিপিডিসি যৌথভাবে অর্থায়ন করবে।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল ১৩২/৩৩/১১ কিলোভোল্ট ক্ষমতার গ্রিড উপকেন্দ্র গঠন, যা বিদ্যুৎ বিতরণ ক্ষমতা বাড়িয়ে সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ ১ জুলাই ২০১৮ থেকে শুরু হয়ে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল।
কাজের অগ্রগতি ধীর হয়ে যাওয়ায় একবারের মধ্যে সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ জুন ২০২৪ নির্ধারণ করা হয়। তবে এই সময়সীমা পার হওয়ার পরেও কোনো শারীরিক নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি; কেবল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও নকশা প্রস্তুতির কাজই সম্পন্ন হয়েছে।
এই পর্যায়ে প্রকল্পের পরামর্শক সংস্থা এখনও তাদের সেবার পুরো অর্থ পায়নি। বকেয়া পরিশোধের স্বার্থে ডিপিডিসি পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটিতে (পিইসি) একটি নতুন সময়সীমা বৃদ্ধির প্রস্তাব পাঠায়, যাতে পরামর্শকের পাওনা শোধ করা যায়।
প্রস্তাবিত বর্ধিত সময়সীমা আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর কথা, তবে তা প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য—ভূগর্ভস্থ উপকেন্দ্রের বাস্তবায়ন—সম্পন্ন করার সম্ভাবনা রাখে না। পিইসির অনুমোদনের পর, পরামর্শকের পাওনা পরিশোধের পর প্রকল্পটি অসম্পূর্ণ অবস্থায় সমাপ্ত করা হবে।
এ পর্যন্ত প্রকল্পে কেবল পরামর্শক সংস্থার ফি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ব্যয় মিলিয়ে প্রায় ৬৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এই অর্থের কোনো শারীরিক অবকাঠামো গঠনে ব্যবহার হয়নি, ফলে তা সম্পূর্ণ অপচয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, সরকারি তহবিলের এই অদক্ষ ব্যবহার বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগকারীর আস্থা ক্ষয় করতে পারে। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ফাঁক থাকলে ভবিষ্যতে অনুরূপ প্রকল্পে তহবিল সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোর জন্যও এই ব্যর্থতা একটি সতর্কতা। ক্ষমতা বৃদ্ধি ও সরবরাহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অবকাঠামো প্রকল্পে সময়মতো অগ্রগতি না হলে গ্রাহকদের অতিরিক্ত লোড শেডিং ও মূল্য বৃদ্ধি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বাজারে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক নয়; বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বাড়ানো জরুরি, যাতে অনাবশ্যক ব্যয় কমে এবং প্রকৃত সেবা প্রদান নিশ্চিত হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের পিইসি সভায় এই বিষয়টি আলোচিত হবে বলে জানা গেছে। সভায় প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা, বকেয়া পরিশোধের পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হবে।
যদি প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাতিল করা হয়, তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ব্যয়ের পুনর্বিবেচনা ও আর্থিক দায়িত্ব নির্ধারণের প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে, বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি পূরণের জন্য বিকল্প উপায় অনুসন্ধান করা জরুরি।
সংক্ষেপে, ৬৪ কোটি টাকার বেশি ব্যয় সত্ত্বেও কোনো শারীরিক অবকাঠামো গড়ে না ওঠা একটি বড় প্রশাসনিক ব্যর্থতা। এটি সরকারি তহবিলের ব্যবহার, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ অবকাঠামো বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে বকেয়া পরিশোধ ও প্রকল্পের সমাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আর্থিক ক্ষতি সীমিত রাখা যায়।



