সুদানের জাতীয় ফুটবল দলকে প্রতিনিধিত্বকারী ২৪ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড জন মানো আফ্রিকান কাপের মরক্কো হোটেলে যুদ্ধের কষ্টের কথা শেয়ার করেছেন। তিনি জানান, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মেদো সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াদি হালফা শহরে গিয়ে দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহের চেষ্টা করছিল। তবে গৃহযুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেদোকে গুলিবিদ্ধ করা হয় এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
মানো বর্ণনা করেন, মেদোকে গুলিবিদ্ধ করার সময় শুটাররা তাকে ২০‑২৫ বার গুলি করে। শুটিংয়ের মুহূর্তে মেদোর কোনো পালানোর সুযোগ ছিল না, এবং তার মৃত্যুর দৃশ্যকে দেখেই মানোকে গভীর শোকের মুখোমুখি হতে হয়। এই ঘটনা দেশের সামরিক ও পারামিলিটারি গোষ্ঠী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স (RSF) ও সেনাবাহিনীর মধ্যে চলমান ক্ষমতা সংগ্রামের সময় ঘটেছে।
সুদানের গৃহযুদ্ধ এপ্রিল ২০২৩-এ শুরু হয় এবং তখন থেকে আনুমানিক ১.৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। জাতিসংঘের মতে, এই সংঘাতকে বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যুদ্ধের ফলে ১.২ কোটি মানুষ তাদের বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে, বিশেষ করে পশ্চিম দারফুরে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ ও গণহত্যার রিপোর্ট রয়েছে।
ফুটবলের ক্ষেত্রে, যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক প্রভাব স্পষ্ট। দেশের প্রধান স্টেডিয়ামগুলো ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে, লিগের প্রতিযোগিতা বন্ধ হয়ে গেছে এবং ক্লাবগুলোকে বিদেশে শিবির স্থাপন করতে বাধ্য করা হয়েছে। আল হিলালের ওমদুরমানের স্টেডিয়াম, যা “ব্লু জুয়েল” নামে পরিচিত, গৃহযুদ্ধের ফলে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আল হিলাল এবং আল মেরিখ, সুদানের দুইটি বৃহত্তম ক্লাব, বর্তমানে রুয়ান্ডার লিগে অংশগ্রহণ করছে। গত মৌসুমে তারা মরিটানিয়ার শীর্ষ লিগে খেলেছিল, তবে দেশীয় লিগের অবস্থা অস্থির হওয়ায় বিদেশি লিগে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছে। এই পরিস্থিতি খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার এবং দেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ উভয়ই অনিশ্চিত করে তুলেছে।
মানো উল্লেখ করেন, তিনি জাতীয় দলের জন্য কয়েক মাস আগে ডেবিউ দিয়েছিলেন, তখনই যুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠে। তার বন্ধুর মৃত্যু এবং দেশের সামগ্রিক অশান্তি তাকে এবং তার সহকর্মীদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করেছে। তবে তিনি বলেন, আফকনের এই মুহূর্তে তারা দেশের জন্য গর্বের সঙ্গে খেলতে চায়, যদিও ঘরোয়া পরিস্থিতি কঠিন।
আফ্রিকান কাপ ২০২৫ চলাকালীন সময়ে মানো এবং তার দলকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুদানের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরতে হবে। তিনি বলেন, “যুদ্ধের কারণে আমাদের লিগ বন্ধ, স্টেডিয়াম ধ্বংস, তবে আমরা দেশের মানুষের জন্য গর্বের সঙ্গে খেলতে চাই।” এই বক্তব্য দেশের জনগণের মধ্যে আশা জাগিয়ে তুলতে পারে।
সুদানের গৃহযুদ্ধের মূল কারণ হল সেনাবাহিনী ও RSF-এর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই, যা দেশের নিরাপত্তা কাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে। উভয় পক্ষই নাগরিকদের ওপর গুলিবিদ্ধ, ধর্ষণ ও জোরপূর্বক স্থানান্তরের অভিযোগে অভিযুক্ত। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার গোষ্ঠী এই অপরাধগুলোকে নিন্দা করেছে এবং শান্তি চুক্তির আহ্বান জানিয়েছে।
যুদ্ধের ফলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়েছে, বেসরকারি খাতের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে এবং মৌলিক সেবা যেমন স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যাহত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ফুটবলের মতো জনপ্রিয় ক্রীড়া কার্যক্রমও থেমে গেছে, যা তরুণদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও শারীরিক বিকাশের মাধ্যম।
মানো এবং তার সহকর্মীরা এখনো দেশের পুনর্গঠন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা কামনা করছেন। তারা আশা করেন, যুদ্ধ শেষ হলে ফুটবল আবার দেশের মানুষের জন্য আনন্দের উৎস হবে এবং তরুণ খেলোয়াড়দের স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করবে।
সুদানের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ফুটবলের উপর প্রভাব সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও মানবিক সংস্থাগুলো নজর রাখছে। যদিও যুদ্ধের পরিণতি এখনও চলমান, তবে আফকনের মঞ্চে সুদানের দলকে দেখার মাধ্যমে বিশ্বকে দেশের সংকটের বাস্তবতা জানাতে পারে।
সর্বশেষে, মানো উল্লেখ করেন যে তার বন্ধুর মৃত্যু তার জন্য ব্যক্তিগত শোকের পাশাপাশি দেশের জন্য একটি বড় ক্ষতি। তিনি বলছেন, “মেডো আমাদের জন্য শুধু বন্ধু নয়, তিনি আমাদের স্বপ্নের অংশ ছিল। তার স্মৃতি আমাদেরকে আরও দৃঢ়ভাবে লড়াই করতে অনুপ্রাণিত করবে।” এই অনুভূতি দেশের বহু ক্রীড়াবিদ ও নাগরিকের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, যারা যুদ্ধের ভয়াবহতা সত্ত্বেও আশা ও স্বপ্নকে ধরে রাখার চেষ্টা করছে।



