ইসরায়েলে গাজা উপত্যকার ওপর দুই বছরব্যাপী সামরিক অভিযান চালিয়ে চলার ফলে, দেশের প্রযুক্তি খাতে কর্মরত বহু পেশাজীবী বিদেশে কর্মসংস্থান সন্ধান করছেন। এই প্রবণতা ইসরায়েলি অ্যাসোসিয়েশন ফর অ্যাডভান্সড টেকনোলজি ইন্ডাস্ট্রিজ (আইএটিআই) এর সর্বশেষ প্রতিবেদনেও স্পষ্ট হয়েছে।
আইএটিআই জানিয়েছে, গাজা ও পশ্চিম তীরের অধিগ্রহণকৃত এলাকায় অবস্থিত প্রায় অর্ধেকের বেশি কোম্পানি—প্রায় ৫৩ শতাংশ—তাদের কর্মীদের স্থানান্তরের অনুরোধ বাড়িয়েছে। এই অনুরোধগুলো মূলত নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং চলমান সংঘাতের প্রভাবের কারণে উত্থাপিত।
প্রযুক্তি খাত ইসরায়েলের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানের ১৫ শতাংশের জন্য দায়ী। তাছাড়া, এই সেক্টরের রফতানি মোট রফতানির অর্ধেকেরও বেশি গঠন করে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মাইক্রোসফ্ট, ইন্টেল, এনভিডিয়া, অ্যামাজন, মেটা এবং অ্যাপলসহ শত শত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইসরায়েলে গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র পরিচালনা করে। তবে, সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, কিছু কোম্পানি তাদের বিনিয়োগ ও কার্যক্রমকে অন্য অঞ্চলে সরানোর পরিকল্পনা বিবেচনা করছে।
যুদ্ধের সময় সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটার ফলে, কিছু প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে বিকল্প সরবরাহকারী ও উৎপাদন লাইন বিদেশে স্থাপন করেছে। এই বিকল্পগুলো কার্যকর হলে, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলি গাজা ও পশ্চিম তীরের অধিগ্রহণকৃত এলাকায় সম্পূর্ণভাবে ফিরে না আসার সম্ভাবনা বাড়ছে।
আইএটিআই-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উচ্চপদস্থ নির্বাহী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে স্থানান্তরের চাহিদা বিশেষভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক কর্মী ইতিমধ্যে বিদেশে চাকরির আবেদন জমা দিয়েছেন, যা মানবসম্পদ বাজারে নতুন গতিবিধি সৃষ্টি করছে।
প্রযুক্তি শিল্পের এই প্রস্থান প্রবণতা ইসরায়েলের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে, উচ্চ দক্ষতা সম্পন্ন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ডেটা সায়েন্টিস্ট এবং গবেষকরা যদি দেশ ছেড়ে যায়, তবে নতুন স্টার্টআপ ও গবেষণা প্রকল্পের বিকাশে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
অন্যদিকে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্যও এই পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জের সমান সুযোগ উপস্থাপন করে। তারা নতুন বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা ও স্থানীয় প্রতিভা ব্যবহার করে ব্যবসা পুনর্গঠন করতে পারে। তবে, ইসরায়েলের প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমের ক্ষতি হলে, দীর্ঘমেয়াদে গ্লোবাল টেক র্যাঙ্কিংয়ে পতন ঘটতে পারে।
সরকারি পর্যায়ে, গাজা সংঘাতের মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলার জন্য নীতি নির্ধারণে চাপ বাড়ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সরবরাহ শৃঙ্খল স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দাবি তীব্রতর হচ্ছে।
ইসরায়েলি প্রযুক্তি সংস্থাগুলোও কর্মীদের উদ্বেগ কমাতে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও মানসিক সহায়তা প্রোগ্রাম চালু করেছে। তবে, বাস্তবিকভাবে কর্মীদের পরিবারিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বের টেক দিগন্তে ইসরায়েলকে “স্টার্টআপ নেশন” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু চলমান সংঘাতের ফলে এই মর্যাদা ঝুঁকির মুখে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও পার্টনারদের কাছ থেকে আস্থা পুনরুদ্ধার করা এখন তাত্ক্ষণিক চ্যালেঞ্জ।
সারসংক্ষেপে, গাজা উপত্যকার ওপর অব্যাহত সামরিক অভিযান এবং তার ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তা উদ্বেগ ইসরায়েলি প্রযুক্তি কর্মীদের বিদেশে স্থানান্তরের ইচ্ছা বাড়িয়ে তুলেছে। এই প্রবণতা দেশের টেক ইকোসিস্টেমের ভবিষ্যৎ গঠন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।



