থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী সোমবার ক্যাম্বোডিয়া সীমান্তে সাম্প্রতিক রাতে ড্রোন উড়িয়ে নতুন চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। থাই কর্তৃপক্ষের মতে, রাত্রিকালীন সময়ে ক্যাম্বোডিয়ার দিক থেকে ২৫০ টিরও বেশি অনমানবিক বায়ুযান সনাক্ত করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতির শর্তের সরাসরি লঙ্ঘন।
এই যুদ্ধবিরতি শনিবার দুপুর ১২ টায় (GMT ০৫:০০) কার্যকর হয় এবং উভয় পক্ষকে বর্তমান সামরিক অবস্থান স্থির রাখতে, নতুন সৈন্য পাঠানো বন্ধ করতে এবং সীমান্তবর্তী নাগরিকদের দ্রুত বাড়ি ফেরার অনুমতি দিতে বাধ্য করেছে। চুক্তিটি চীনের এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সহায়তায় কয়েক দিনের আলোচনার পর স্বাক্ষরিত হয়, যা দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হয়।
থাই সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ক্যাম্বোডিয়ার ড্রোন উড়ানকে “উদ্বেগজনক প্ররোচনা” এবং “শান্তি রক্ষার জন্য গৃহীত ব্যবস্থা ভঙ্গ” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই কার্যক্রমকে চুক্তির শর্তের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে তারা উল্লেখ করেছে এবং ভবিষ্যতে আরও কঠোর পদক্ষেপের সম্ভাবনা উন্মুক্ত করেছে।
থাই কর্তৃপক্ষ একই সঙ্গে জুলাই থেকে থাই ভূখণ্ডে আটক থাকা ১৮ ক্যাম্বোডিয়ান সৈন্যের মুক্তি নিয়ে পুনর্বিবেচনা করার সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে। তারা জানিয়েছে, যদি সীমান্তে লঙ্ঘন অব্যাহত থাকে এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের হুমকি বাড়ে, তবে থাইল্যান্ডকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতে পারে।
ক্যাম্বোডিয়া এখনো এই অভিযোগের কোনো মন্তব্য প্রকাশ করেনি। তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ওয়াং ই তার সাম্প্রতিক মন্তব্যে এই যুদ্ধবিরতিকে “কঠিন পরিশ্রমের ফল” বলে প্রশংসা করেছেন, আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই সমঝোতাকে “দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত সমাপ্তি” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
থাইল্যান্ড ও ক্যাম্বোডিয়ার সীমান্ত বিরোধের শিকড় শতাব্দীরও বেশি পুরনো, যা ঐতিহাসিকভাবে বহুবার উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এই বছর শুরুর দিকে ক্যাম্বোডিয়ার একটি গোষ্ঠী পুরাতন মন্দিরে জাতীয় গীত গেয়ে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়, যা পরবর্তীতে মে মাসে একটি ক্যাম্বোডিয়ান সৈন্যের মৃত্যু ঘটায়।
মে মাসের সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক দশকের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে আসে। পরবর্তী পাঁচ দিন ধরে সীমান্তে তীব্র লড়াই চলতে থাকে, যার ফলে শত শত সৈন্য ও বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারায় এবং হাজারো মানুষ তাদের বাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।
জুলাই মাসে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা অক্টোবর মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। তবে এই মাসের শুরুর দিকে নতুন সংঘর্ষের ফলে চুক্তি আবার ভেঙে যায়, যা উভয় পক্ষের মধ্যে পুনরায় উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, থাইল্যান্ড ও ক্যাম্বোডিয়ার সীমান্তে চলমান এই সংঘাত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তারা বলছেন, যদি দুই দেশ দ্রুত কূটনৈতিক চ্যানেল পুনরায় চালু না করে এবং পারস্পরিক বিশ্বাস পুনর্নির্মাণ না করে, তবে এই অঞ্চলে আরও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নীতি দল ইতিমধ্যে পরবর্তী কূটনৈতিক আলোচনার সময়সূচি নির্ধারণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশেষ করে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই বিষয়টি উত্থাপিত হতে পারে, যা উভয় দেশের মধ্যে শান্তি রক্ষার জন্য বহুপাক্ষিক চাপ বাড়াবে।
থাই সেনাবাহিনীর শেষ বিবৃতি অনুসারে, যদি ক্যাম্বোডিয়া এই লঙ্ঘন বন্ধ না করে, তবে থাইল্যান্ডকে নিজস্ব নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই পরিস্থিতি দু’দেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



