সুদানের সরকার‑সমর্থিত সেনাবাহিনী (SAF) প্রধান জেনারেল আবদেল ফাতাহ আল‑বুরহান তৃতীয় বর্ষে প্রবেশ করা গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি শুধুমাত্র র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স (RSF) আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সম্ভব বলে জোর দিয়েছেন। তিনি তুরস্কের অ্যানকারায় সরকারি সফরের সময় সুদানি সম্প্রদায়কে সম্বোধন করে বলেছিলেন, “সামরিক সমাধান বলতে যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, বরং অস্ত্র ত্যাগের মাধ্যমে সমাপ্তি হতে পারে”। এই মন্তব্যের পটভূমিতে দেশটি মানবিক সংকটের অগ্রভাগে, যেখানে ক্ষুধা, স্থানচ্যুতি এবং গ্রাম‑গ্রামকে শূন্য শহরে রূপান্তরিত করা যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ছে।
আল‑বুরহান অ্যানকারা সফরের সময় উল্লেখ করেন, “যুদ্ধ শেষ হবে যখন অস্ত্রগুলো মাটিতে রাখা হবে” এবং রাজনৈতিক সমঝোতা যা RSF‑এর অস্ত্রনিরস্ত্রীকরণ ছাড়া সম্ভব নয়, তা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তার এই অবস্থান রিএসএফের নেতৃত্বে থাকা মিলিশিয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ইউনাইটেড নেশনসের মহাসচিব আন্তোনিও গুটেরেস শুক্রবার সুদানের গৃহযুদ্ধের অবিলম্বে অস্ত্রবিরতির আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই সংঘাত বিশ্বে সবচেয়ে খারাপ মানবিক সংকটের দিকে নিয়ে গেছে। গুটেরেসের এই আবেদন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে এবং মানবিক সাহায্যের প্রবাহ পুনরায় চালু করতে উৎসাহিত করে।
সুদানের মানবিক পরিস্থিতি তীব্রতর হয়ে দাঁড়িয়েছে। হোয়াইট নাইল রাজ্যের কোস্টি শহরে হাজার হাজার পরিবার রাস্তায় শোয়েছে, তাদের খাবার সীমিত রুটি ও সেদ্ধ ডাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় ১.২ কোটি মানুষ দেশের বিভিন্ন অংশে অনিশ্চিত অবস্থায় বেঁচে আছে, যা পুরো দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান।
কোস্টি শহরের বাসিন্দারা নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা স্বস্তি পেয়েও তাদের পেট খালি। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং সুদানি রেড ক্রিসেন্টের কর্মীরা জানান, শরণার্থীর সংখ্যা বাড়ার ফলে মৌলিক সরবরাহে বড় ফাঁক দেখা দিচ্ছে। “খাদ্য, ওষুধ, বিশেষ করে শিশুর ওষুধের তীব্র ঘাটতি রয়েছে,” এক সংস্থার প্রতিনিধিরা জানান। তারা তৎক্ষণাত দাতব্য সংস্থার সহায়তা চেয়ে আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্তর্জাতিক তহবিলের পতন এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বহু দেশ ও সংস্থা আর আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক হওয়ায় মানবিক সাহায্যের সরবরাহে বড় ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। এই আর্থিক সংকটের ফলে খাদ্য, চিকিৎসা ও শরণার্থী ক্যাম্পের মৌলিক অবকাঠামো বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আল‑বুরহানের রিএসএফের আত্মসমর্পণ দাবি দেশের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থার ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। যদি রিএসএফ অস্ত্র ত্যাগ না করে, তবে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে। অন্যদিকে, যদি কোনো সমঝোতা হয়, তবে তা দেশের পুনর্গঠন, শরণার্থী পুনর্বাসন এবং মানবিক সহায়তার পুনরায় চালু করার পথ খুলে দিতে পারে।
সুদানের গৃহযুদ্ধের তৃতীয় বর্ষে, মানবিক সংকটের তীব্রতা এবং রাজনৈতিক অমীমাংসিততা একসঙ্গে দেশের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ত্বরিত হস্তক্ষেপ এবং দেশীয় নেতৃত্বের বাস্তবিক পদক্ষেপই এখন সময়ের দাবি, যাতে যুদ্ধের শেষ এবং মানবিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়।



