চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপিওসি (People’s Bank of China) জানিয়েছে যে, ১ জানুয়ারি থেকে ডিজিটাল ইউয়ানের ব্যবস্থাপনা ও কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করার জন্য একটি নতুন “অ্যাকশন প্ল্যান” কার্যকর করা হবে। পরিকল্পনার দায়িত্বে আছেন পিপিওসির উপ-গভর্নর লু লেই, যিনি সম্প্রতি একটি সরকারি মিডিয়া আউটলেটের মাধ্যমে এই বিষয়টি প্রকাশ করেছেন। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হল ডিজিটাল ইউয়ানকে আধুনিক ডিজিটাল পেমেন্ট ও লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, যা আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে সম্পূর্ণভাবে সংহত হবে।
লু লেই উল্লেখ করেন যে, নতুন পরিকল্পনার অধীনে “মেজারমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক, ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, অপারেটিং মেকানিজম এবং ইকোসিস্টেম” সহ একাধিক উপাদান অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই কাঠামো ডিজিটাল ইউয়ানের ব্যবহারযোগ্যতা বাড়াতে এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ডিজিটাল ইউয়ান ব্যালেন্সে সুদ প্রদান করবে, যা ব্যবহারকারীদের এই মুদ্রা গ্রহণে উৎসাহিত করবে।
অতিরিক্তভাবে, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শাংহাইতে একটি আন্তর্জাতিক ডিজিটাল ইউয়ান অপারেশনস সেন্টার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও রয়েছে। শাংহাই, যা চীনের পূর্বাঞ্চলের আর্থিক কেন্দ্র, সেখানে এই কেন্দ্রের মাধ্যমে বৈশ্বিক লেনদেনের সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সহজতর করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিজিটাল মুদ্রা নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষায় মনোনিবেশ করেছে। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় অনলাইন পেমেন্টের চাহিদা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল, এবং বিটকয়েনের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সির জনপ্রিয়তা বাড়ার ফলে ডিজিটাল মুদ্রার প্রতি আগ্রহও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে চীনের পিপিওসি ২০১৪ সাল থেকে ডিজিটাল মুদ্রা নিয়ে কাজ করে আসছে এবং বিভিন্ন পাইলট প্রোগ্রামের মাধ্যমে “ডিজিটাল ইউয়ান” বা “ই-সিএনওয়াই” পরীক্ষা করেছে।
দেশব্যাপী ভোক্তারা ইতিমধ্যে মোবাইল ও অনলাইন পেমেন্টে অভ্যস্ত, তবে ডিজিটাল ইউয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাংককে লেনদেনের ডেটা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর তুলনায় অধিক স্বায়ত্তশাসন দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই মুদ্রা সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ইস্যু ও প্রচলিত হবে, ফলে আর্থিক সিস্টেমের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা বাড়বে।
ডিজিটাল ইউয়ানের এই নতুন পর্যায়ের সূচনা চীনের আর্থিক বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। সুদ প্রদান নীতি গ্রাহকদের ডিজিটাল ইউয়ান ব্যবহার বাড়াবে, যা পেমেন্ট ইকোসিস্টেমে নতুন প্রবাহ সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক অপারেশনস সেন্টার শাংহাইতে প্রতিষ্ঠা হলে চীনের বৈশ্বিক আর্থিক প্রভাব বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডিজিটাল ইউয়ানের ব্যবহার সহজ হবে।
অন্যদিকে, এই পরিকল্পনা চীনের প্রযুক্তি জায়ান্টদের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। বর্তমানে আলিবাবা, টেনসেন্ট ইত্যাদি বড় কোম্পানি মোবাইল পেমেন্টে আধিপত্য বজায় রেখেছে, তবে ডিজিটাল ইউয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকায় তাদের বাজার শেয়ার হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন কৌশল গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা ডিজিটাল ইউয়ানের সঙ্গে সমন্বয় করে সেবা প্রদান করতে পারে।
চীনের আর্থিক নীতি নির্ধারকরা উল্লেখ করেছেন যে, ডিজিটাল ইউয়ানকে একটি আধুনিক পেমেন্ট মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, নিরাপত্তা প্রোটোকল এবং ব্যবহারকারী অভিজ্ঞতা উন্নত করা অপরিহার্য। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, পিপিওসি বিভিন্ন ব্যাংক ও ফিনটেক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেম গড়ে তুলবে, যেখানে লেনদেনের গতি, খরচ এবং নিরাপত্তা সবই সর্বোচ্চ মানের হবে।
এই উদ্যোগের আর্থিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের পূর্বাভাসে, বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে, ডিজিটাল ইউয়ানের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চীনের মুদ্রা নীতি আরও নমনীয় হবে। সুদ প্রদান নীতি গ্রাহকদের মুদ্রা ধরে রাখার প্রণোদনা দেবে, ফলে নগদ প্রবাহে পরিবর্তন আসবে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নতুন হাতিয়ার যোগ হবে। তবে, একই সঙ্গে মুদ্রা সরবরাহের অতিরিক্ত বৃদ্ধি বা সুদের হার পরিবর্তনের ফলে বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, যা সতর্ক পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
সারসংক্ষেপে, চীনের নতুন ডিজিটাল ইউয়ান অ্যাকশন প্ল্যান ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে এবং এতে মেজারমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক, ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, অপারেটিং মেকানিজম এবং ইকোসিস্টেমের সমন্বয় থাকবে। ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ডিজিটাল ইউয়ান ব্যালেন্সে সুদ প্রদান করবে, এবং শাংহাইতে আন্তর্জাতিক অপারেশনস সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো চীনের আর্থিক বাজারে নতুন গতিশীলতা আনবে, প্রযুক্তি জায়ান্টদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে এবং মুদ্রা নীতি ও পেমেন্ট সিস্টেমে রূপান্তর ঘটাবে।



