আসাদ শাসনের পতনের পর, তুরস্কে বসবাসরত শরণার্থীদের মধ্যে বাড়ি ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা বাড়ছে। গাজিয়ান্তেপের দক্ষিণ-পূর্বে সীমানার কাছাকাছি একটি মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসা ১৮ বছর বয়সী আহমেদ, দুই বছরের মধ্যে সিরিয়ায় ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলছেন, সিরিয়ার মজুরি কম হওয়ায় প্রথমে সঞ্চয় করতে চান, তবে ভবিষ্যতে দেশটি পুনর্নির্মাণের পর স্বর্ণের মতো উজ্জ্বল হবে বলে তিনি আশাবাদী।
আহমেদের মতই, গাজিয়ান্তেপের প্রাচীন দুর্গের পাথরের প্রাচীরের নিচে ৩২ বছর বয়সী আয়া মুস্তাফা, তার স্বদেশ আলেপো থেকে দু’ঘণ্টার দূরত্বে বসবাস করছেন। তিনি জানান, সিরিয়ার বাসিন্দা সম্প্রদায়ে প্রত্যেক দিন ফিরে যাওয়ার বিষয়টি আলোচনা হয়। তার পরিবার পূর্বে আইনজীবী ও শিক্ষক ছিলেন, এবং এখনো সিরিয়ার পুনর্গঠনের অপেক্ষায় আছেন।
আসাদের পদত্যাগের পর, তুরস্কে বসবাসরত শরণার্থীর সংখ্যা অর্ধ মিলিয়নের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধের সূচনা থেকে তুরস্ক সিরিয়ান শরণার্থীদের জন্য প্রধান আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল, এবং শীর্ষে পৌঁছালে শরণার্থীর সংখ্যা ৩.৫ মিলিয়ন পর্যন্ত গিয়েছিল। এই বড় সংখ্যার ফলে তুর্কি জনমত ও রাজনৈতিক পরিবেশে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে, এবং কখনও কখনও বিদেশি বিরোধী হামলাও ঘটেছে।
সরকারি দিক থেকে কোনো শরণার্থীকে জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তন করা হয় না, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রশাসনিক শর্তাবলী কঠোর হয়েছে এবং স্বাগত কমে যাওয়ার অনুভূতি বাড়ছে। সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলো জানিয়েছে, কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের সময় এসেছে এমন সংকেত পাচ্ছেন। এক অজানা সিরিয়ান নারী উল্লেখ করেছেন, তার তুর্কি বন্ধু ও প্রতিবেশীরা জিজ্ঞেস করে কেন এখনও তুরস্কে আছেন, এবং সবাই একসাথে প্রত্যাবর্তন করলে বিশৃঙ্খলা হতে পারে বলে সতর্কতা দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের সংস্থা গুলো তুরস্কের শরণার্থী নীতি পর্যবেক্ষণ করছে। তারা উল্লেখ করেছে, সিরিয়ার পুনর্গঠন প্রক্রিয়া যদি স্থিতিশীল হয়, তবে শরণার্থীদের স্বেচ্ছাসেবী প্রত্যাবর্তনকে সমর্থন করা হবে। তুর্কি সরকারও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কাজের অনুমতি ও বাসস্থান সংক্রান্ত নিয়ম কঠোর করেছে, যা শরণার্থীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
অঞ্চলীয় বিশ্লেষকরা তুরস্কের এই পরিবর্তনকে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক গতিবিধির অংশ হিসেবে দেখছেন। তারা বলেন, সিরিয়ার রাজনৈতিক শূন্যতা এবং তুরস্কের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের সমন্বয়ে শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের প্রবণতা বাড়ছে। একই সঙ্গে, রাশিয়া ও ইরানের সিরিয়ার পুনর্গঠনে ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন দিক উন্মোচিত হচ্ছে, যা শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
গাজিয়ান্তেপের স্থানীয় বাজারে দেখা যায়, শরণার্থীরা কাজের সুযোগের জন্য তুর্কি শ্রমবাজারে প্রবেশের চেষ্টা করছে, তবে বেতন কম এবং কাজের নিরাপত্তা কম। এই পরিস্থিতি তাদেরকে দ্রুত সঞ্চয় করে বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা করতে উদ্বুদ্ধ করছে। আহমেদ ও আয়ার মতো তরুণরা, যদিও এখনও তুরস্কে বসবাস করছেন, তবে তারা ভবিষ্যতে সিরিয়ার পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হলে স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
তুর্কি সরকার সম্প্রতি শরণার্থীদের জন্য নতুন রেজিডেন্স পারমিটের শর্তাবলী প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে আর্থিক স্বনির্ভরতা ও কাজের চুক্তি প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা অন্তর্ভুক্ত। এই নীতি শরণার্থীদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে, যা তাদের প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি, যেখানে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ ও মৌলিক সেবা পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে, তুর্কি শরণার্থীদের জন্য একটি সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার মাত্রা এখনও অনিশ্চিত, যা প্রত্যাবর্তনের সময়সূচি নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে।
সারসংক্ষেপে, তুরস্কে বসবাসরত শরণার্থীরা, বিশেষ করে গাজিয়ান্তেপের তরুণ প্রজন্ম, আসাদের পতনের পর সিরিয়ার পুনর্গঠনকে আশার আলো হিসেবে দেখছে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা করছে। একই সঙ্গে, তুর্কি প্রশাসনের নতুন নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পর্যবেক্ষণ শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের গতিপথকে গঠন করছে।



