বাংলাদেশের গার্মেন্টস রপ্তানি গত বছর পশ্চিমা বাজারে বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০২৪ সালে সুতা আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রেডিমেড গার্মেন্টস (RMG) শিল্পের মূল কাঁচামাল হিসেবে সুতা দেশের উৎপাদনের চেয়ে বেশি পরিমাণে বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল হয়েছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (BTMA) অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট ১২.১৫ লাখ টন সুতা (প্রধানত কটন সুতা) আমদানি করা হয়েছে, যা ২০২৩ সালের ৯.২৪ লাখ টনের তুলনায় ৩১.৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি। এই পরিমাণগত উত্থান গার্মেন্টস রপ্তানির বৃদ্ধির সরাসরি ফলাফল হিসেবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
সুতার মোট মূল্য প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ ভারত থেকে এসেছে। ভারতীয় সরবরাহকারীরা প্রতিযোগিতামূলক দামের পাশাপাশি বড় পরিমাণে সময়মতো ডেলিভারি নিশ্চিত করতে সক্ষম, যা স্থানীয় মিলগুলোর তুলনায় আকর্ষণীয় বিকল্প তৈরি করেছে।
স্থানীয় গার্মেন্টস উৎপাদনকারীরা সুতা আমদানি বেছে নেওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে তিনটি বিষয় উল্লেখ করেছে: প্রথমত, ভারতের দামের সুবিধা; দ্বিতীয়ত, বড় কন্টেইনারে শিপমেন্টের সক্ষমতা; তৃতীয়ত, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিয়মের কারণে দেশীয় মিলের উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস।
দুই থেকে দুই দশমিক সেন্ট প্রতি কিলোগ্রাম দামের পার্থক্য স্থানীয়ভাবে স্পিন করা সুতা ও ভারতীয় আমদানি সুতা মধ্যে স্পষ্ট ফাঁক তৈরি করে। এই পার্থক্য গার্মেন্টস রপ্তানিকারকদের জন্য খরচ কমিয়ে লাভ বাড়ানোর সুযোগ দেয়।
স্থানীয় স্পিনিং সেক্টর দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। গ্যাসের ঘাটতি উৎপাদন লাইনের বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং উৎপাদন ক্ষমতার হ্রাস ঘটায়। এই সমস্যার ফলে দেশীয় সুতা উৎপাদনের খরচ বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলকতা কমে যায়।
ফেব্রুয়ারি ২০২৩-এ গ্যাসের দাম ১৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি স্পিনিং মিলের উৎপাদন ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। গ্যাস মূল্যের এই তীব্র বৃদ্ধি স্থানীয় মিলগুলোকে আর্থিক চাপের মধ্যে ফেলেছে এবং আমদানি সুতা ব্যবহারকে আরও লাভজনক করে তুলেছে।
আগস্ট মাসে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরপরই শ্রমিকদের প্রতিবাদ এবং বিশাল ধর্মঘটের ফলে বেশ কয়েকটি টেক্সটাইল মিল এক মাসেরও বেশি সময় বন্ধ থাকতে বাধ্য হয়। এই অস্থিরতা উৎপাদন ধারাবাহিকতাকে ব্যাহত করে এবং রপ্তানি সময়সূচি নষ্ট করে, ফলে রপ্তানিকারকরা নিরাপদ সরবরাহের জন্য আমদানির দিকে ঝুঁকেছে।
বাংলাদেশ সরকার টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতে প্রণোদনা কমিয়ে দেয়, যা স্থানীয় স্পিনিং শিল্পের আর্থিক সহায়তা হ্রাস করে। একই সময়ে, ভারত সরকার টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শিল্পের জন্য বিভিন্ন নগদ প্রণোদনা বাড়িয়ে দেয়, যা ভারতীয় সুতা উৎপাদনকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, সুতা আমদানির এই প্রবণতা দেশের গার্মেন্টস শিল্পের সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন ভারসাম্য তৈরি করবে। স্বল্পমেয়াদে আমদানি বৃদ্ধির ফলে রপ্তানি সক্ষমতা বজায় থাকবে, তবে দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সরবরাহের স্থিতিশীলতা এবং নীতি সমর্থন না পেলে দেশীয় স্পিনিং সেক্টরের পুনরুদ্ধার কঠিন হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ২০২৪ সালে সুতা আমদানি বৃদ্ধি এবং ভারতের প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে উত্থান বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের খরচ কাঠামোকে পুনর্গঠন করেছে। গ্যাসের দাম, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সরকারী প্রণোদনা ভবিষ্যতে এই প্রবণতার দিকনির্দেশ নির্ধারণ করবে। শিল্পের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিযোগিতামূলকতা নিশ্চিত করতে স্থানীয় উৎপাদন পরিবেশের উন্নতি জরুরি।



