চট্টগ্রাম শহরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মাহবুবুল আলমের গাড়ি দুর্ঘটনা এবং পরবর্তীতে ডায়াবেটিস রোগ নির্ণয় দেশের স্বাস্থ্য পরিসংখ্যানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ৩৫ বছর বয়সী আলমের ডান হাতের একটি অংশ কেটে যাওয়ার পর ক্ষত সেরে উঠতে বেশি সময় নেয়া, শ্বাসকষ্ট এবং তৃষ্ণা বাড়ার লক্ষণ দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডায়াবেটিস ক্লিনিকে পরীক্ষা করে টাইপ‑২ ডায়াবেটিস নিশ্চিত করা হয় এবং নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ শুরু করা হয়।
দুর্ঘটনা ঘটার এক মাসেরও বেশি সময়ে ক্ষতটি ঠিকমতো সেরে উঠছিল না, ফলে আলমের শারীরিক অবস্থায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তিনি হালকা হাঁটলেও শ্বাসকষ্ট অনুভব করতে শুরু করেন এবং প্রচণ্ড তৃষ্ণা বাড়ে। এই উপসর্গগুলোকে উপেক্ষা না করে ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং করা হয়, যেখানে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া যায়। চিকিৎসকের নির্দেশে তিনি এখনো নিয়মিত রক্তের শর্করা পরীক্ষা এবং ওষুধ গ্রহণে নিয়োজিত।
বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (IDF) অনুযায়ী প্রায় ৫৩ কোটি। এর মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, যেখানে বেশিরভাগই কর্মজীবী বা ব্যবসায়িক পেশা নিয়ে কাজ করেন। এই বৃহৎ সংখ্যা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যায়, প্রতি হাজার জনের মধ্যে ৪৩ জনের বেশি ডায়াবেটিসের লক্ষণ রয়েছে। তবে চট্টগ্রাম বিভাগে এই হার সর্বোচ্চ, যেখানে প্রতি হাজারে ৪৮ থেকে ৫০ জনের মধ্যে ডায়াবেটিসের রোগ রয়েছে। অন্য কথায়, চট্টগ্রামে প্রতি ২০ জনের মধ্যে একজন রোগে আক্রান্ত, যা দেশের গড় ২৫ জনে একজনের তুলনায় বেশি।
এই তথ্যগুলো ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে’ নামে একটি বৃহৎ গবেষণার ফলাফল। গবেষণাটি ২০২৪ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত চালু ছিল এবং আটটি বিভাগে মোট ১,৮৯,৯৮৬ জনের ৯০ দিনের স্বাস্থ্য তথ্য সংগ্রহ করা হয়। চট্টগ্রাম বিভাগে ২৫,৩৫১ জনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২,৮৯৬ জন গ্রামীণ এবং ১২,৪৫৫ জন শহরাঞ্চলের বাসিন্দা।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী চট্টগ্রাম জেলার মোট জনসংখ্যা ৯১,৬৯,৪৬৫। এই সংখ্যা এবং জরিপে পাওয়া ১ প্রতি ২০ জনের ডায়াবেটিসের হার মিলিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৪,৪৯,০০০ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসক ও বিবিএসের কর্মকর্তারা বলেন, এই অনুমান বাস্তবের কাছাকাছি এবং রোগীর বেশিরভাগই এখনও তাদের অবস্থার সম্পর্কে জানেন না।
ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণগুলো প্রায়শই অজানা থাকে, ফলে রোগী সময়মতো পরীক্ষা না করায় রোগের অগ্রগতি দ্রুত হয়। বিশেষ করে শহুরে এলাকায় ব্যস্ত জীবনযাত্রা, অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং শারীরিক অনুশীলনের অভাব এই রোগের বিস্তার বাড়িয়ে দেয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন, নিয়মিত রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা এবং সঠিক খাবার নির্বাচন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া, ওজন নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত শারীরিক কার্যকলাপ এবং ধূমপান ত্যাগ করাও রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।
চট্টগ্রামের বাসিন্দা হিসেবে আপনি যদি শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ধীর ক্ষত সেরে ওঠা ইত্যাদি লক্ষণ অনুভব করেন, তবে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গ্লুকোজ পরীক্ষা করানো উচিত। ডায়াবেটিসের প্রাথমিক সনাক্তকরণ রোগের অগ্রগতি রোধে এবং জীবনমান উন্নত করতে সহায়তা করে। আপনার স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য আজই রক্তে শর্করা পরীক্ষা করুন—আপনার ভবিষ্যৎ আপনার হাতে।



