যুক্তরাজ্য সরকার গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানকে সমর্থনকারী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদরত কর্মীদের ওপর কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দেশকে আধুনিক পুলিশি রাষ্ট্রের দিকে অগ্রসর হওয়ার অভিযোগের মুখে পড়েছে। কিয়ার স্টারমার নেতৃত্বাধীন লেবার সরকারকে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সমালোচনা করা হচ্ছে, বিশেষ করে গাজা গণহত্যার বিরোধে সশস্ত্র প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী কর্মীদের ওপর প্রয়োগ করা কঠোর দমনমূলক ব্যবস্থা নিয়ে।
গত নভেম্বর থেকে আটজন মানবাধিকার কর্মী প্রাক-বিচার অবস্থায় অনশন পালন করছেন। তাদের গ্রেফতারের মূল কারণ ছিল গাজা গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমত গঠন এবং ইসরায়েলি অস্ত্র নির্মাতা এলবিট সিস্টেমসের কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা। অনশনরত কর্মীরা শুধু মুক্তি দাবি করছেন না, তারা ব্রিটিশ সরকারের ইসরায়েলি লবির প্রভাব এবং ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠনকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার নীতির কঠোর বিরোধিতা করছেন।
বিবাদে উঠে এসেছে যে রয়্যাল এয়ার ফোর্স গাজা অঞ্চলে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে সরাসরি সহায়তা করছে, যা পরোক্ষভাবে যুক্তরাজ্যকে গাজা গণহত্যার সহযোগী করে তুলতে পারে। সরকার এই অভিযানের উদ্দেশ্যকে জিম্মি উদ্ধার হিসেবে উপস্থাপন করেছে, তবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মতে এই ব্যাখ্যা ভিত্তিহীন। ঐতিহাসিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাজি বাহিনীর বিরুদ্ধে গৌরব অর্জনকারী রয়্যাল এয়ার ফোর্সের বর্তমান কর্মকাণ্ডকে অনেক যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসবিদ কলঙ্কিত করছেন।
স্টারমার, যিনি পূর্বে মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন, তার সরকারকে সমালোচনা করা হচ্ছে যে তারা ব্যাপক গ্রেফতার ও মতপ্রকাশের দমন চালিয়ে যাচ্ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, গাজা-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা বিরোধী প্রতিবাদে প্রায় দুই হাজার সাতশেরও বেশি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে বয়স্ক ও শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত, যারা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য পুলিশি হিংসার শিকার হয়েছেন।
এই পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে তীব্র বিতর্ক চলছে। বিরোধী দলগুলো সরকারকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের লঙ্ঘন এবং গাজা জনগণের প্রতি ন্যায়বিচারহীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সরকারী পক্ষ যুক্তি দিচ্ছে যে গাজা অঞ্চলে গৃহীত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য অপরিহার্য, তবে বিরোধীরা দাবি করছে যে এই নীতি গৃহীত হওয়ার ফলে যুক্তরাজ্যকে একটি দমনমূলক রাষ্ট্রের পথে নিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও ঐতিহাসিক গৌরবের জন্য হুমকি স্বরূপ। তারা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, যদি সরকার গাজা-সংক্রান্ত মানবাধিকার উদ্বেগকে উপেক্ষা করে এবং নিরাপত্তা কাঠামোকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে দেশের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক স্বাতন্ত্র্য ও নাগরিক স্বাধীনতা হ্রাস পেতে পারে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে যুক্তরাজ্যের নীতি নিয়ে সমালোচনা বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
অধিকন্তু, গাজা-সংক্রান্ত প্রতিবাদে গ্রেফতারকৃত কর্মীদের অবস্থা ও তাদের অনশনকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা যুক্তরাজ্য সরকারকে গ্রেফতারকৃতদের দ্রুত মুক্তি এবং আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছে। একই সঙ্গে, গাজা-সংক্রান্ত নীতি পুনর্বিবেচনা করে ইসরায়েলি লবির প্রভাব কমাতে এবং ফিলিস্তিনীয় অধিকার রক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হচ্ছে।
সংক্ষেপে, যুক্তরাজ্যের গাজা-সংক্রান্ত নীতি ও তার বিরোধী প্রতিবাদে গৃহীত কঠোর পদক্ষেপ দেশকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। স্টারমার সরকারের এই পদক্ষেপগুলোকে আধুনিক পুলিশি রাষ্ট্রের লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে গভীর বিভাজন ও ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। পার্লামেন্টের আলোচনার ফলাফল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া যুক্তরাজ্যের মানবাধিকার নীতি ও গ্লোবাল অবস্থান নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখবে।



