মেক্সিকোর দক্ষিণ‑পশ্চিম ওয়াক্সাকা রাজ্যের নিঝান্ডা শহরের কাছাকাছি একটি ট্রেনের ডিগে ডিগে বাঁক নেওয়ার সময় রেলপথ থেকে বেরিয়ে পড়ে, ফলে ১৩ জনের মৃত্যু এবং প্রায় ১০০ জনের আহত হয়। দুর্ঘটনায় মোট ২৪১ যাত্রী ও নয়জন ক্রু সদস্য জড়িত ছিল, যা দেশের নৌবাহিনীর মালিকানাধীন ইন্টারওশেনিক রেললাইন।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ট্রেনটি গালফ অব মেক্সিকো ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে সংযোগকারী রুটে চলছিল। ডিগে ডিগে বাঁক নেওয়ার সময় রেলপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে রেল ট্র্যাকের বাইরে পড়ে এবং কিছু অংশে ক্লিফের পাশে ঝুঁকে যায়। ফলে যাত্রীদের নিরাপদে নেমে যাওয়ার জন্য উদ্ধারকর্মীরা তৎক্ষণাৎ কাজ শুরু করে।
মেক্সিকো নৌবাহিনী জানায়, মোট ৯৮ জন আহত হয়েছে, যার মধ্যে ৩৬ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর, যা প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউমের মন্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে। শেইনবাউম জানান, নৌবাহিনীর সচিবসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
দুর্ঘটনা স্থল থেকে প্রাপ্ত ছবিতে দেখা যায়, রেলগাড়ি রেলপথ থেকে বেরিয়ে পড়ে ক্লিফের পাশে অর্ধেক ঝুঁকে আছে, এবং উদ্ধারকর্মীরা যাত্রীদের নিরাপদে নেমে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি ও রোপ ব্যবহার করছেন। কিছু যাত্রী গাড়ির ভেতরে আটকে থাকা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
ইন্টারওশেনিক ট্রেনটি প্যাসিফিকের সালিনা ক্রুজ ও গালফের কোয়াটসাকোয়ালকোসকে সংযুক্ত করে, এবং এতে দুটি লোকোমোটিভ ও চারটি যাত্রী গাড়ি রয়েছে। মেক্সিকোর নৌবাহিনী দেশের রেল নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে, তাই এই দুর্ঘটনা নৌবাহিনীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তুলেছে।
ওয়াক্সাকা গভর্নর স্যালোমন জারা ক্রুজ ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে, এবং উল্লেখ করেন যে রাজ্য ও ফেডারেল সংস্থাগুলি একত্রে আহতদের সহায়তা ও পুনরুদ্ধার কাজ চালিয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হবে।
ইন্টারওশেনিক রেল লিঙ্কটি দুই বছর আগে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওব্রাদোর উদ্যোগে উদ্বোধন করা হয়। এই প্রকল্পটি তেহুয়ান্তেপেক উপদ্বীপের ইস্টহামাসকে আধুনিকায়ন করে, প্যাসিফিক ও গালফের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যিক রুট তৈরি করার লক্ষ্যে চালু করা হয়।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই রেল লিঙ্কটি কেবল যাত্রী পরিবহন নয়, পণ্যবাহী ট্রেনের মাধ্যমে আঞ্চলিক শিল্প ও বন্দরগুলোর সংযোগ বাড়াবে। ফলে মেক্সিকোর দক্ষিণাঞ্চলকে একটি কৌশলগত বাণিজ্যিক করিডোরে রূপান্তরিত করার লক্ষ্য রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই দুর্ঘটনা মেক্সিকোর বৃহত্তর রেল অবকাঠামো প্রকল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে। আন্তর্জাতিক পরিবহন বিশ্লেষক রামোন্দো গারসিয়া বলেন, “মেক্সিকোর রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের সময় নিরাপত্তা মানদণ্ডকে অগ্রাধিকার দেওয়া না হলে, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “এই ধরনের দুর্ঘটনা বিনিয়োগকারীর আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং বাণিজ্যিক করিডোরের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।”
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট শেইনবাউমের সরকার রেল নিরাপত্তা ও জরুরি সেবা উন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দের কথা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে, ফেডারেল সরকার রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ সিস্টেমকে আধুনিকায়ন করার পরিকল্পনা করছে, যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্ঘটনা রোধ করা যায়।
এই ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া মেক্সিকোর বাণিজ্যিক কৌশলকে পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ট্রেড পার্টনাররা মেক্সিকোর রেল অবকাঠামোর নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, এবং দু’পাশের সরকারকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে।
সারসংক্ষেপে, ওয়াক্সাকায় ঘটিত ট্রেন ডিগে ডিগে দুর্ঘটনা ১৩ জনের প্রাণ হারানো এবং প্রায় ১০০ জনের আঘাতের কারণ হয়েছে। নৌবাহিনী, ফেডারেল ও রাজ্য কর্তৃপক্ষের ত্বরিত প্রতিক্রিয়া সত্ত্বেও, এই ঘটনা মেক্সিকোর রেল নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে, যা দেশের কৌশলগত বাণিজ্যিক লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



