ঢাকা, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ – দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো গতকাল সন্ধ্যায় একত্রিত হয়ে রাজনৈতিক সংঘর্ষে শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া রোধে কঠোর সমঝোতা গড়ে তোলার আহ্বান জানায়। সভা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সম্মেলন হলের মধ্যে, যেখানে আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সহ অন্যান্য পার্টির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় আলোচিত মূল বিষয় ছিল রাজনৈতিক হিংসার ফলে শিশুরা প্রায়শই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। সরকারী তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত রাজনৈতিক বিরোধে মোট ১২টি শিশুর মৃত্যু ও ৩৫টি গুরুতর আঘাতের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। এসব ঘটনার বেশিরভাগই নির্বাচনী ক্যাম্পেইন, র্যালি বা বিরোধী দলের সমাবেশের সময় ঘটেছে, যেখানে গুলিবিদ্ধ, গুলিবিদ্ধের শিকার বা গুলিবিদ্ধের আশেপাশে থাকা শিশুরা আহত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সভা শুরু হয়, যেখানে তিনি রাজনৈতিক সহিংসতা রোধে আইন প্রয়োগের কঠোরতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, “শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো রাজনৈতিক পার্থক্যের বাইরে, এটি আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।” তিনি অতিরিক্তভাবে বললেন, ভবিষ্যতে নির্বাচনের আগে ও পরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার তদারকি বাড়াতে বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে।
বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া সভায় উপস্থিত থেকে সমঝোতার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, “রাজনৈতিক বিরোধে শিশুরা যেন কোনো দায়িত্বের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে আমাদের সকলেরই একসাথে কাজ করতে হবে।” তিনি অতিরিক্তভাবে বললেন, পার্টির তরুণ সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য একটি যৌথ কর্মসূচি চালু করা হবে।
বিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে, জয়ন্তা সরকারী পার্টির তরফ থেকে কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তারা উল্লেখ করেন, বর্তমান আইন প্রয়োগের কাঠামোতে কিছু ফাঁক রয়েছে, যা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা বাড়িয়ে দেয়। তারা প্রস্তাব করেন, স্বতন্ত্র ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা সভা চালু করে প্রতিটি ঘটনার বিশ্লেষণ করা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনী গ্রহণ করা।
সভায় উপস্থিত অন্যান্য দলগুলোর প্রতিনিধিরাও সমঝোতার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। তারা একমত যে, শিশুরা রাজনৈতিক মঞ্চে না এসে নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠা উচিত। এজন্য তারা সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিশুদের উপস্থিতি সীমিত করার জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা চায় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়।
সমঝোতার মূল বিষয়গুলোতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে: (১) রাজনৈতিক সমাবেশে শিশুদের উপস্থিতি নিষেধাজ্ঞা, (২) গুলিবিদ্ধের আশেপাশে নিরাপত্তা জোন স্থাপন, (৩) গুলিবিদ্ধের সময় জরুরি চিকিৎসা সেবা দ্রুত প্রদান, (৪) রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যৌথ নজরদারি কমিটি গঠন, এবং (৫) আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ।
এই সমঝোতা বাস্তবায়নের জন্য সরকার ও বিরোধী দলগুলো আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পরিকল্পনা প্রস্তুত হলে তা সংসদে উপস্থাপন করে আইনসভার অনুমোদন নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের সমঝোতা যদি সঠিকভাবে কার্যকর করা হয়, তবে রাজনৈতিক সহিংসতার হার কমে যাবে এবং শিশুরা নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারবে। তবে তারা সতর্ক করেন, সমঝোতার বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ না করলে তা কেবল কাগজে থাকা একটি ঘোষণা হয়ে যাবে।
অবশেষে, সকল রাজনৈতিক দল একমত যে, শিশুরা ভবিষ্যতের মূলধন এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের ভিত্তি। সমঝোতার সফলতা নির্ভর করবে পার্টিগুলোর আন্তঃবিভাগীয় সহযোগিতা, আইন প্রয়োগের স্বচ্ছতা এবং সমাজের সচেতনতার উপর। ভবিষ্যতে এই উদ্যোগের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হবে, যাতে রাজনৈতিক সহিংসতা আর শিশুর নিরাপত্তা হুমকির মুখে না থাকে।



