জাতীয় সংসদ নির্বাচন মাত্র ১৬ দিন দূরে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াত‑ই‑ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠন করে, যা দলের অভ্যন্তরে বিশাল বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। জোটের ঘোষণার পর দলটির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ নিয়ে প্রশ্ন তীব্রভাবে উত্থাপিত হয়েছে।
এনসিপি ২৮ ফেব্রুয়ারি এই বছর আত্মপ্রকাশের পর থেকে রাজনৈতিক মঞ্চে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করে আসছে। দলটি চব্বিশের আন্দোলনের স্বরূপে গড়ে ওঠা তরুণ নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত এবং মূলত বিচ্ছিন্নতা ও বৈষম্যের বিরোধে কাজ করেছে। তবে সাম্প্রতিক জোটের সিদ্ধান্ত তার মূল আদর্শের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ দেখা দিচ্ছে।
দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জোটকে ‘নির্বাচনি সমঝোতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা এবং বিচার‑আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা বজায় রাখা এনসিপির জন্য অপরিহার্য। তার মতে, জামায়াত‑ই‑ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন না করলে নির্বাচনী পরিসরে পার হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এই যুক্তি দলের কিছু সদস্যের সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বিকালের মধ্যে করা হয়, যেখানে এনসিপি এবং জামায়াত‑ই‑ইসলামীর প্রতিনিধিরা একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। জোটের লক্ষ্যকে ‘বৃহত্তর ঐক্য’ এবং ‘বিচার‑আধিপত্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তবে এই ঘোষণার পরপরই দলের অভ্যন্তরে পদত্যাগের শৃঙ্খল শুরু হয়।
প্রধান্যপূর্ণ পদত্যাগের মধ্যে রয়েছে মাহফুজ আলমের ঘোষণাপত্র, যেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে তিনি এনসিপির অংশ হবেন না। মাহফুজের এই সিদ্ধান্তের পেছনে জোটের সঙ্গে তার মতবিরোধ এবং দলের মূল নীতির পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ উল্লেখ করা হয়।
মাহফুজ আলম পূর্বে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে কাজ করেছেন। তিনি ছাত্র কমিটি ও এনসিপি গঠনের সময় থেকে সক্রিয় ছিলেন এবং দলটির নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জোটের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে তাসনিম জারার পদত্যাগও উল্লেখযোগ্য। তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিবের পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং তার পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে দলের অভ্যন্তরে অস্থিরতা বাড়ে। তাসনিমের পদত্যাগের পরপরই যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবিনও রোববার রাতে তার পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
তাজনূভা জাবিনের পদত্যাগের সময় তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না। তার এই সিদ্ধান্তের পেছনে জোটের সঙ্গে তার মতবিরোধ এবং দলের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে অনিশ্চয়তা উল্লেখ করা হয়। তাজনূভা ছাড়াও কেন্দ্রীয় স্তরের আরও কয়েকজন নেতার পদত্যাগের গুজব ছড়িয়ে পড়েছে, যা দলের সংহতি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জোটের প্রভাব নিয়ে দ্বিমত পোষণ করছেন। একদিকে তারা বলেন, জামায়াত‑ই‑ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন এনসিপির ভোটার ভিত্তি বিস্তৃত করতে পারে এবং নির্বাচনী মঞ্চে দৃশ্যমানতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে তারা সতর্ক করেন, জোটের ফলে দলের স্বতন্ত্রতা হারিয়ে যেতে পারে এবং চব্বিশের আন্দোলনের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুতি ঘটতে পারে।
বিশেষ করে চব্বিশের আন্দোলনের স্বরূপে গড়ে ওঠা এনসিপির জন্য জোটের সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে নিয়ে এসেছে। দলটি কি তার মূল নীতি বজায় রেখে বৃহত্তর রাজনৈতিক জোটে সফল হতে পারবে, নাকি অভ্যন্তরীণ বিভাজন তার কার্যকারিতা হ্রাস করবে, তা এখনই স্পষ্ট নয়।
নির্বাচনের দিন পর্যন্ত মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি, এনসিপি এখন তার প্রচার কৌশল পুনর্গঠন করতে বাধ্য। জোটের সঙ্গে সমন্বয় করে কীভাবে ভোটারদের কাছে পৌঁছানো যাবে, তা দলের নেতৃত্বের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে পদত্যাগপ্রাপ্ত নেতাদের প্রভাব এবং তাদের সমর্থকদের সম্ভাব্য বিচ্ছিন্নতা মোকাবেলা করা জরুরি।
এনসিপির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ এখনো অনিশ্চিত, তবে স্পষ্ট যে দলটি এখনো তার রাজনৈতিক পরিচয় সংরক্ষণ এবং নির্বাচনী সফলতা অর্জনের জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জোটের ফলে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং বাহ্যিক বিশ্লেষকদের দ্বিধা দলকে কৌশলগতভাবে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে।
যদি এনসিপি জোটের মাধ্যমে বৃহত্তর ভোটার গোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করতে পারে, তবে তা তার রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, যদি জোটের ফলে দলের মূল আদর্শ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে তার ভিত্তি দুর্বল করতে পারে। এই দ্বৈত সম্ভাবনা নির্বাচনের ফলাফলে কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই প্রকাশ করবে।



