ঢাকা, গুলশান ক্লাবের প্রেস কনফারেন্সে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (BTMA) স্পিনিং শিল্পের বর্তমান সংকট তুলে ধরেছে। ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভারত থেকে ইয়ারের আমদানি ১৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশীয় দামের চেয়ে প্রতি কিলোগ্রাম কমে তিন দশা সেন্টের বেশি কমে বিক্রি হচ্ছে। ফলে স্থানীয় মিলগুলোতে টাকার ১.২ ট্রিলিয়ন (১২,০০০ কোটি) মূল্যের অমিল স্টক জমে আছে।
BTMA সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল উল্লেখ করেন, এই পরিস্থিতিতে প্রায় পঞ্চাশটি স্থানীয় স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি নিজস্ব এক মিলের বন্ধের কথা জানান এবং আরেকটি মিলের আর্থিক অবস্থা ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিটি মিলের প্রাথমিক বিনিয়োগ ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার মধ্যে, যা পুনরায় শুরু করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাসেল বলেন, বাংলাদেশকে ভারতীয় ইয়ারের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। অতীতে ভারত হঠাৎ করে বাংলাদেশের জন্য কটন রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, যা স্থানীয় স্পিনারদের বড় ক্ষতি করেছে। যদি ভবিষ্যতে একই ধরনের হঠাৎ বন্ধ ঘটে, গার্মেন্টস সেক্টরের সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ সরকার ভূমি সীমানা দিয়ে ভারতীয় ইয়ারের আমদানি নিষিদ্ধ করে, যাতে দেশীয় উৎপাদনকে রক্ষা করা যায়। তবে সমুদ্রপথে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য নয়, ফলে সীমানা পারাপার থেকে এখনও বড় পরিমাণে সস্তা ইয়ারের প্রবাহ চলমান।
মিলাররা সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা না দিয়ে বাণিজ্যিক ফাঁক কমাতে চান। তারা দাবি করেন, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ভারসাম্য পুনর্গঠন করা প্রয়োজন, যাতে বাংলাদেশী শিল্পের প্রতিযোগিতা বজায় থাকে। এছাড়া, দেশীয়ভাবে প্রচুর উৎপাদিত কিছু নির্দিষ্ট ধরণের ইয়ারের উপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাবও করা হয়েছে।
রাসেল উল্লেখ করেন, ভারতীয় বাজারের রক্ষামূলক নীতি বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশকে প্রভাবিত করে। তার কোম্পানি একবার কলকাতায় রয়্যাল ক্রাউন কোলা রপ্তানি করেছিল, কিন্তু ১৫ দিনের মধ্যে ভারতীয় সরকার পণ্যের উপর শুল্ক বাড়িয়ে দেয়, যা ব্যবসায়িক ক্ষতি ঘটায়।
BTMA এর তথ্য অনুযায়ী, গার্মেন্টস ও প্রাথমিক টেক্সটাইল সেক্টরে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ বিশাল, তবে সস্তা আমদানি এই বিনিয়োগের রিটার্নকে হুমকির মুখে ফেলছে। শিল্পের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে নীতি সমন্বয় জরুরি।
বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করেন, যদি ভারতীয় ইয়ারের দাম দেশীয় দামের নিচে অব্যাহত থাকে, তবে আরও মিল বন্ধ হতে পারে এবং বেকারত্বের হার বাড়বে। একই সঙ্গে, রপ্তানি ক্ষমতা হ্রাস পাবে, যা দেশের বাণিজ্য ঘাটতিতে প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে, সরকারী নিষেধাজ্ঞা সীমানা পারাপার থেকে সস্তা ইয়ারের প্রবাহকে সম্পূর্ণ থামাতে পারে না, কারণ সমুদ্রপথে এখনও বড় পরিমাণে আমদানি হয়। এই ফাঁক পূরণে শুল্ক বাড়ানো বা কোটা নির্ধারণের কথা আলোচনা চলছে।
মিলারদের মতে, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা না দিয়ে নির্দিষ্ট ধরণের ইয়ারে সীমা আরোপ করা বেশি কার্যকর হতে পারে। এতে দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করা যাবে এবং একই সঙ্গে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের ঝুঁকি কমবে।
BTMA এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় স্পিনিং মিলের আর্থিক অবস্থা দুর্বল, এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন। তাই শিল্পের পুনরুজ্জীবনের জন্য সরকারী সহায়তা, যেমন আর্থিক প্রণোদনা ও রপ্তানি সুবিধা, প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদে, বাংলাদেশকে বৈচিত্র্যময় কাঁচামাল সরবরাহ চ্যানেল গড়ে তুলতে হবে, যাতে একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমে। এদিকে, স্থানীয় গবেষণা ও উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে উচ্চ মানের ইয়ারের উৎপাদন বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
সারসংক্ষেপে, ভারতীয় ইয়ারের তীব্র প্রবাহ এবং মূল্য পার্থক্য স্থানীয় স্পিনিং শিল্পকে সংকটে ফেলেছে। সরকার ও শিল্প উভয়েরই সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষা, স্থানীয় উৎপাদনকে সুরক্ষা এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নীতি নির্ধারণে স্বচ্ছতা, সময়মত শুল্ক সমন্বয় এবং শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী কাস্টমস নিয়মের পরিবর্তনই মূল চাবিকাঠি হবে।



