দ্বিতীয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালে, জুলাই ২০২২ উত্থানের প্রাক্তন নেতা মাহফুজ আলম ফেসবুকের মাধ্যমে স্পষ্ট করে জানান, তিনি জামায়াত‑এনসিপি জোটের অংশ হবেন না। এই ঘোষণার সঙ্গে তিনি জোটের প্রার্থী হওয়ার কোনো প্রস্তাব পেয়েছেন এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেন।
জামায়াত‑ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ত্রয়োদশ নির্বাচনের জন্য সমঝোতা ঘোষণার পর, কিছু নেতা ও সমর্থককে জোটের প্রার্থী হিসেবে নামাজ করা হয়। তবে মাহফুজ আলমের পোস্টে উল্লেখ আছে, তাকে কোনো প্রার্থী প্রস্তাব করা হয়নি, এবং তিনি জোটের সঙ্গে যুক্ত হতে চান না। তার এই অবস্থান জোটের অভ্যন্তরে ইতিমধ্যে গড়ে ওঠা বিভাজনের প্রতিফলন।
মাহফুজ আলম ২০২২ সালের জুলাই উত্থানের মূল নেতাদের একজন ছিলেন এবং সেই সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে সদস্য ছিলেন। উত্থানের সময় তিনি যুব ও ছাত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতেন, এবং এনসিপি ও নাগরিক কমিটিতে তার প্রভাব উল্লেখযোগ্য ছিল। এই পটভূমি তাকে রাজনৈতিক মঞ্চে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছিল।
এই মাসের শুরুর দিকে তিনি উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন, এবং তার পর থেকে তিনি এনসিপি থেকে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চালু হয়। তবে জামায়াত‑এনসিপি জোটের চূড়ান্ত সমঝোতার পর, তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে তিনি আর জোটের সঙ্গে যুক্ত হবেন না। তার এই সিদ্ধান্ত জোটের কৌশলগত সমন্বয়কে প্রভাবিত করতে পারে।
ফেসবুকে তার পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, গত দেড় বছর তিনি জুলাই উত্থানের সহযোদ্ধাদের সঙ্গে পরামর্শ, নির্দেশনা ও নীতিগত সহযোগিতা করেছেন। তিনি বলেন, এই দুই সংগঠনে তার অংশগ্রহণ মূলত সমন্বয়মূলক কাজের ভিত্তিতে ছিল, এবং এখন সেই সম্পর্ক শেষ হয়েছে। তার বক্তব্যে অতীতের সহযোগিতা ও বর্তমান বিচ্ছিন্নতার স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে।
মাহফুজ আলম বলেন, জুলাই উত্থানের সহযোদ্ধাদের প্রতি তার সম্মান ও বন্ধুত্ব অটুট থাকবে, তবে তিনি এনসিপি জোটের অংশ হতে চান না। তিনি জোটের প্রার্থী হওয়ার চেয়ে তার দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। এই অবস্থান তার পূর্বের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তার পোস্টে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক লড়াই, সামাজিক ফ্যাসিবাদ মোকাবিলা, পুনর্মিলন ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠনের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই ধারণাগুলো তিনি এবং তার সহযোদ্ধারা বহুবার উত্থাপন করেছেন, তবে এনসিপি সেগুলোকে যথাযথভাবে গ্রহণ করেনি। ফলে তিনি জোটের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না বলে সিদ্ধান্ত নেন।
মাহফুজ আলম এনসিপিকে একটি স্বতন্ত্র, বৃহৎ জুলাই ছত্রের অধীনে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, কিন্তু বিভিন্ন কারণের জন্য তা সফল হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, সংগঠনের অভ্যন্তরে মতবিরোধ ও কাঠামোগত সমস্যার কারণে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। এই ব্যর্থতা তাকে জোট থেকে দূরে সরে যাওয়ার দিকে ধাবিত করেছে।
মাহফুজ আলমের পাশাপাশি এনসিপির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নেতারাও জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে মতবিরোধ প্রকাশ করেছেন। কেউ দল ছেড়ে গেছেন, আবার কেউ জোটের প্রতি তীব্র বিরোধিতা করেছেন। এই অভ্যন্তরীণ অমিল জোটের সংহতি ও নির্বাচনী কৌশলকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, মাহফুজ আলমের এই সিদ্ধান্ত এনসিপি ও জামায়াতের জোটের ভোটাভাটির সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে, বিশেষত যুব ও ছাত্র ভোটারদের মধ্যে তার প্রভাব বিবেচনা করলে। জোটের জন্য নতুন প্রার্থী খুঁজে বের করা এবং সমঝোতার ভিত্তি পুনর্গঠন করা প্রয়োজন হতে পারে। ভবিষ্যতে এই বিচ্ছিন্নতা নির্বাচনী ফলাফলে কী প্রভাব ফেলবে তা পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
মোটের ওপর, মাহফুজ আলমের ঘোষণায় স্পষ্ট হয়েছে যে তিনি জামায়াত‑এনসিপি জোটের অংশ হতে চান না এবং তার দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখবেন। তার এই পদক্ষেপ এনসিপি ও জামায়াতের সমঝোতার স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে নতুন মোড় দিয়েছে।



