বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই সপ্তাহে ইউরোপে মদ্যপানের প্রভাব বিশ্লেষণ করে একটি নতুন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মহাদেশে প্রতি বছর প্রায় আট লক্ষ মানুষ অ্যালকোহলজনিত কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন। এই সংখ্যা স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপ বিশ্বে সর্বোচ্চ গড় অ্যালকোহল সেবনের মাত্রা ধারণ করে। প্রতি ব্যক্তি গড়ে যে পরিমাণ মদ্যপান করে, তা অন্যান্য মহাদেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই উচ্চ সেবন হারই মৃত্যুর হার বাড়ানোর প্রধান কারণগুলোর একটি।
অ্যালকোহল সেবন কেবল মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায় না, বরং আঘাতজনিত রোগের হারও বাড়িয়ে দেয়। অকালমৃত্যু এবং আঘাতের ক্ষেত্রে মদ্যপান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, বিশেষ করে রাস্তায় দুর্ঘটনা এবং কাজের সময় ঘটিত দুর্ঘটনা।
WHO-এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, মদ্যপান আন্তঃব্যক্তিক সহিংসতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। আক্রমণ, পারিবারিক নির্যাতন এবং অন্যান্য সহিংস ঘটনার ক্ষেত্রে অ্যালকোহল প্রায়ই প্ররোচনাকারী হিসেবে কাজ করে। ফলে, ইউরোপীয় অঞ্চলে সহিংস আঘাতজনিত মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ হিসেবে মদ্যপান চিহ্নিত হয়েছে।
তরুণ প্রজন্মের উপর মদ্যপানের প্রভাব বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বয়ঃসন্ধিকাল এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের প্রথম কয়েক বছর মস্তিষ্কের বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময়, যখন অ্যালকোহল গ্রহণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও আচরণকে প্রভাবিত করে।
মস্তিষ্কের এই সংবেদনশীল পর্যায়ে অতিরিক্ত মদ্যপান নিউরাল সংযোগকে দুর্বল করে, ফলে যুক্তি, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে, তরুণরা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে লিপ্ত হতে পারে, যা আঘাত বা মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়ায়।
অ্যালকোহল স্মৃতিশক্তি এবং শেখার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। নিয়মিত সেবন মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসে পরিবর্তন আনে, যা নতুন তথ্য সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে বাধা সৃষ্টি করে। শিক্ষার গুণগত মানের উপর এই প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়াতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে অ্যালকোহল ব্যবহার ব্যাধি (AUD) এবং বিভিন্ন মানসিক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। ডিপ্রেশন, উদ্বেগ এবং অন্যান্য সাইকিয়াট্রিক সমস্যার সঙ্গে অ্যালকোহল প্রায়ই সহ-উপস্থিত থাকে, যা চিকিৎসার জটিলতা বাড়িয়ে দেয়।
কিশোর ও তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অ্যালকোহলজনিত আঘাতজনিত অক্ষমতা একটি প্রধান স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ। সড়ক দুর্ঘটনা, হিংসা এবং অপ্রত্যাশিত ঘটনার ফলে শারীরিক অক্ষমতা ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা দেখা দেয়।
এই বয়স গোষ্ঠীর মধ্যে অকালমৃত্যুর হারও অ্যালকোহলজনিত কারণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তরুণদের মধ্যে অ্যালকোহলজনিত মৃত্যুর সংখ্যা মোট মৃত্যুর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গঠন করে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
স্বাস্থ্য নীতিনির্ধারক ও সমাজের সকল স্তরে মদ্যপান সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। অ্যালকোহল সেবনের সীমা নির্ধারণ, তরুণদের জন্য শিক্ষা প্রোগ্রাম এবং সহায়তা সেবা গড়ে তোলা এই সমস্যার সমাধানে মূল পদক্ষেপ হতে পারে।
অবশেষে, ব্যক্তিগত দায়িত্বের পাশাপাশি সরকারী নীতি ও সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা এবং অ্যালকোহল নির্ভরতা মোকাবিলার জন্য বিশেষায়িত কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কার্যকর হতে পারে। আপনার পরিবার ও সমাজে অ্যালকোহল ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা কি আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ হবে?



