ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ২৭ ডিসেম্বর তার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে জানিয়েছেন যে তেহরান যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইউরোপের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই দেশগুলো ইরানের স্বায়ত্তশাসনকে বাধা দিতে চায় এবং তা স্বীকার না করে ইরানকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে বাধা দেয়।
এই মন্তব্যটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর শীঘ্রই অনুষ্ঠিত বৈঠকের আগে প্রকাশিত হয়। আল জাজিরা ২৭ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে পেজেশকিয়ানের বক্তব্য বৈঠকের পূর্বে প্রকাশিত হয়।
পেজেশকিয়ানের মন্তব্যের পটভূমি হল, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের তেহরানের ওপর আক্রমণের ছয় মাস পর, সেপ্টেম্বর মাসে ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। চীন ও রাশিয়া এই নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে, ফলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তীব্র দ্বিমত দেখা দেয়।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানের সামরিক বাহিনী এখন পূর্বের তুলনায় অধিক শক্তিশালী। সরঞ্জাম ও জনশক্তির ক্ষেত্রে ইরান পূর্বের চেয়ে বেশি সক্ষম, যা তাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র অবস্থানে রাখে। তিনি যুক্তি দেন, ইরানের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা দেশের স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পেজেশকিয়ান আরও সতর্কতা প্রকাশ করে বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা ইউরোপ আবার আক্রমণ চালায়, তবে ইরান তাৎক্ষণিক ও দৃঢ় প্রতিক্রিয়া জানাবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান কোনো হুমকির মুখে নীরব থাকবে না এবং তার প্রতিক্রিয়া নির্ধারিত হবে শক্তিশালী ও সিদ্ধান্তমূলক।
প্রেসিডেন্টের মতে, বর্তমান সংঘাত পূর্বের যেকোনো যুদ্ধের তুলনায় ভিন্ন এবং আরও জটিল। তিনি উল্লেখ করেন, এই যুদ্ধ ইরাকের যুদ্ধের চেয়েও কঠিন, কারণ এতে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক মাত্রা একসাথে জড়িয়ে আছে। এই বিশ্লেষণ ইরানের নিরাপত্তা নীতির পরিবর্তনকে নির্দেশ করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সন্দেহ প্রকাশ করে চলেছে, যদিও তেহরান বারবার এই অভিযোগ অস্বীকার করে। ইরানের পারমাণবিক নীতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্কের বিষয়, যা নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপের মূল কারণ।
জুন মাসে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের তীব্র সংঘাত শুরু হয়। ইসরায়েলি শক্তি তেহরানের সামরিক ও পারমাণবিক সুবিধা, পাশাপাশি বেসামরিক এলাকায় আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণকে ইরানি কর্তৃপক্ষ ‘আগ্রাসনমূলক হামলা’ বলে চিহ্নিত করে।
ইরানীয় সূত্র অনুযায়ী, ওই আক্রমণে এক হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য, যা মানবিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। ইরান এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক সমর্থন ও মানবিক সাহায্য চায়।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলি আক্রমণে যোগ দেয় এবং ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনা বোমা হামলার শিকার হয়। এই পদক্ষেপকে ইরান ‘অবৈধ হস্তক্ষেপ’ বলে নিন্দা করে এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে।
সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বিকাশে দেখা যায়, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এই সপ্তাহান্তে ফ্লোরিডার মার‑এ‑লাগো রিসোর্টে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই বৈঠকটি যুক্তরাষ্ট্র‑ইসরায়েল‑ইরান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই ঘটনাগুলো বহু প্রশ্ন উত্থাপন করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলো নিষেধাজ্ঞা নীতি পুনর্বিবেচনা করতে পারে, আর চীন ও রাশিয়া ইরানের পক্ষে কূটনৈতিক সমর্থন বাড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ, বিশেষত পারমাণবিক নীতি ও স্যান্কশন সংক্রান্ত, ইরানের কূটনৈতিক কৌশলকে প্রভাবিত করবে।
সারসংক্ষেপে, পেজেশকিয়ানের বক্তব্য ইরানের নিরাপত্তা নীতি ও কূটনৈতিক অবস্থানকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করে। পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কূটনৈতিক সংলাপের দরজা বন্ধ নয়, তবে ভবিষ্যতে কী ধরনের সমঝোতা হবে তা এখনও অনিশ্চিত।



