গাজা উপত্যকায় শীতল বৃষ্টিপাত ও তীব্র বাতাসের কারণে রেমাল পাড়া, গাজা শহরের পশ্চিমে, ৩০ বছর বয়সী আলাা মারওয়ান জুহা নামের এক ফিলিস্তিনি নারী মারা গেছেন। একই সময়ে তার পরিবারে কয়েকজন আহত হয়েছেন। গাজা স্ট্রিপে প্রায় ৯ লক্ষ মানুষ তম্বুতে বাস করছেন, যাঁদের জীবন এখন তীব্র আবহাওয়ার হুমকির মুখে।
রাতের বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরনো প্রাচীরগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। রেমাল পাড়ার একটি আংশিক ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীর হঠাৎ বাতাসের চাপের নিচে ভেঙে যায় এবং সরাসরি জুহার তম্বুর ওপর পড়ে। প্রাচীরের ধসে যাওয়া অংশটি তম্বুকে ধ্বংস করে, ফলে নারীটি মৃত্যুবরণ করেন এবং তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য গমগমে আঘাত পায়।
শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে গাজা উপত্যকায় ধারাবাহিক বৃষ্টিপাত ও তীব্র বাতাসের ঝড় চলছে। হাজার হাজার তম্বু ভেজা, উড়ে যায় অথবা পানিতে ডুবে যায়। বৃষ্টির ফলে গাজার বেশ কয়েকটি প্রধান সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে, এবং বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে।
এই শীতল ঝড়ের ফলে তম্বুতে থাকা শরণার্থীদের নিরাপত্তা আরও হুমকির মুখে পড়েছে। তম্বুতে থাকা পরিবারগুলো প্রায়ই বৃষ্টির পানিতে ভেজে যায়, এবং বাতাসের তীব্রতা তাদের সাময়িক আশ্রয়কে অকার্যকর করে তুলেছে। জুহার পরিবারে আঘাতপ্রাপ্তদের মধ্যে বয়সী শিশুরাও রয়েছে, যা মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
ইস্রায়েলি সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় প্রায় ১.৫ মিলিয়ন মানুষ তম্বুতে বাস করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে যে তম্বুতে থাকা শরণার্থীরা শীতল তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও বাতাসের সম্মিলিত প্রভাবের কারণে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় রয়েছে।
ফিলিস্তিনি এনজিও নেটওয়ার্কের পরিচালক আমজাদ শাওয়া উল্লেখ করেছেন যে নিম্নচাপের সিস্টেম গাজার মানবিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। তিনি বলেন, তম্বুতে থাকা শরণার্থীদের জন্য কোনো বাস্তবিক সুরক্ষা নেই এবং দ্রুত মোবাইল বাড়ি বা ক্যারাভান সরবরাহের প্রয়োজন। শাওয়া আরও উল্লেখ করেন যে সেচ নেটওয়ার্কের ধ্বংসের ফলে পরিষ্কার পানির অভাব বাড়ছে, যা রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
শাওয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইস্রায়েলের ওপর মানবিক সহায়তা সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ বাড়াতে আহ্বান জানান। তিনি গাজা উপত্যকাকে “বিপর্যয়পূর্ণ এলাকা” বলে উল্লেখ করে, মানবিক প্রোটোকল অনুযায়ী পর্যাপ্ত আশ্রয় প্রদান করা উচিত বলে জোর দেন।
ইউনাইটেড নেশন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে গাজায় মানবিক সহায়তার প্রবাহ দ্রুততর করার জন্য ইস্রায়েলকে আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বশীল দপ্তরও গাজার মানবিক সংকটের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে, সীমান্তে সহায়তা প্রবেশের অনুমতি বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে ইস্রায়েলি কর্তৃপক্ষ এখনও নিরাপত্তা উদ্বেগের ভিত্তিতে সীমাবদ্ধতা বজায় রেখেছে, যা আন্তর্জাতিক আলোচনায় তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, গাজায় শীতল ঝড়ের প্রভাব পূর্বের শীতকালীন সংঘর্ষের তুলনায় বেশি মারাত্মক, কারণ তম্বুতে থাকা শরণার্থীদের জন্য কোনো স্থায়ী আশ্রয় নেই। অতীতের গৃহযুদ্ধের সময়েও তীব্র বৃষ্টিপাতের ফলে শরণার্থীদের ক্ষতি হয়েছে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইস্রায়েলের অবরোধ ও সরবরাহ সীমাবদ্ধতা একত্রে মানবিক সংকটকে তীব্রতর করেছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই মাসে কমপক্ষে ১৫ জন ব্যক্তি, যার মধ্যে তিনজন শিশুও রয়েছে, হাইপোথার্মিয়া থেকে মারা গেছেন। বৃষ্টির তীব্রতা ও তাপমাত্রার হ্রাসের ফলে শীতল রোগের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, এবং চিকিৎসা সুবিধা সীমিত হওয়ায় মৃত্যুর হার বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানবিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান সত্ত্বেও, গাজার শরণার্থীরা এখনো তীব্র শীতল ঝড়ের মুখে। পরবর্তী কয়েক দিন থেকে তাপমাত্রা আরও কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, এবং বৃষ্টিপাতের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। তাই তম্বুতে থাকা শরণার্থীদের জন্য দ্রুত স্থায়ী আশ্রয় ও মৌলিক সেবার সরবরাহই একমাত্র সম্ভাব্য রক্ষা পথ।



