লিবিয়া ও তুরস্কের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা সম্পর্কিত একটি সরকারি সফরের পর, লিবিয়ার সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আল-হাদ্দাদ এবং তার সহকর্মী চারজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তুর্কি বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়ে মিসরাতা ও অন্যান্য শহরে সমাধি করা হয়েছে। দুর্ঘটনা মঙ্গলবার তুর্কির কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ঘটেছে; এতে আল-হাদ্দাদ, তার সিনিয়র উপদেষ্টা মোহাম্মদ আল-এসসাওয়ি, সামরিক ক্যামেরাম্যান মোহাম্মদ আল-মাহজুব, পাশাপাশি লিবিয়ার সেনা স্থল বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল ফেতৌরি গরেবিল এবং সামরিক উৎপাদন বিভাগের প্রধান মাহমুদ আল-গেদেভি নিহত হয়েছেন।
বিমানটি অ্যানকারা থেকে লিবিয়ার আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সরকার, ত্রিপলির রাজধানী, ফিরে আসার পথে টার্কি পার্লামেন্টের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর ভোটের পরপরই ধসে পড়ে। তুর্কি পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তে তুরস্কের সৈন্যদের লিবিয়ায় উপস্থিতি বাড়িয়ে দুই দেশের সামরিক সমন্বয় শক্তিশালী করার লক্ষ্য ছিল। দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে তুর্কি কর্তৃপক্ষ প্রযুক্তিগত ত্রুটিকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
লিবিয়ার একটি সামরিক কমিটি দ্রুত অ্যানকারায় পৌঁছে তদন্তে সহায়তা করার জন্য একটি দল পাঠায়। কমিটির একজন সদস্যের মতে, উভয় দেশই উড্ডয়ন রেকর্ডারকে নিরপেক্ষ কোনো দেশে পাঠিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করার সম্মতিতে পৌঁছেছে। রেকর্ডার থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দুর্ঘটনার সঠিক কারণ নির্ধারণের কাজ চলছে।
দুর্ঘটনা স্থল থেকে উদ্ধারকৃত দেহাংশগুলো বিশাল বিশৃঙ্খলার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছিল; দেহাংশের বিচ্ছিন্নতা এতটাই ছিল যে সনাক্তকরণের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘ সময়ের পর DNA বিশ্লেষণের মাধ্যমে মৃতদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায় এবং তাদের দেহ লিবিয়ার নিজ নিজ শহরে ফেরত পাঠানো হয়।
তুর্কি সামরিক বাহিনী শনিবার সকালে মৃতদের সম্মানে একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করে, এরপর দেহগুলো লিবিয়ার দিকে উড়িয়ে নেওয়া হয়। তবে দেহের স্থানান্তর ও সমাধি প্রক্রিয়ায় কিছু জটিলতা দেখা দেয়; সমাধি ও শোকের অনুষ্ঠান কোথায় ও কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে তা নিয়ে আলোচনা চালু হয়। শেষ পর্যন্ত আল-হাদ্দাদ ও তার সহকর্মীরা মিসরাতার নিজ শহরে সমাধি করা হয়, যেখানে স্থানীয় জনগণ শোকের ছায়া ছড়িয়ে রাখে।
এই ঘটনার পর লিবিয়ার সামরিক কাঠামোতে বড় ধরনের শূন্যতা দেখা দেয়। আল-হাদ্দাদ সেনাবাহিনীর প্রধান স্টাফ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ভূমিকা পালন করতেন; তার মৃত্যু লিবিয়ার নিরাপত্তা নীতি ও তুর্কি-লিবিয়ান সামরিক সমন্বয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তুর্কি পার্লামেন্টের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে এই দুর্ঘটনা একসাথে লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিলতা বাড়িয়ে তুলেছে।
একজন বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, “লিবিয়ার সেনাবাহিনীর শীর্ষ স্তরের নেতাদের হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া দেশীয় নিরাপত্তা কাঠামোকে অস্থির করে তুলবে, এবং তুর্কি-লিবিয়ান সামরিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন হবে।” তুর্কি কর্তৃপক্ষের প্রযুক্তিগত ত্রুটি নির্দেশ করা বিবৃতি এবং উড্ডয়ন রেকর্ডারকে নিরপেক্ষ দেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত উভয় দেশের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস বজায় রাখতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
লিবিয়ার সরকার ইতোমধ্যে মৃতদের পরিবারকে সমর্থন জানিয়ে, শোকের সময়ে যথাযথ ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি অনুসরণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তুর্কি সরকারও লিবিয়ার সঙ্গে সমন্বিতভাবে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এই ঘটনাটি লিবিয়া-তুর্কি সামরিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে; উভয় দেশই এখন নিরাপত্তা সহযোগিতা ও সামরিক উপস্থিতি সংক্রান্ত নীতিগুলো পুনরায় মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের দুঃখজনক ঘটনা এড়ানো যায়। অঞ্চলীয় নিরাপত্তা পরিবেশের পরিবর্তন, বিশেষ করে উত্তর আফ্রিকায় তুর্কির বাড়তি উপস্থিতি, লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি ও সমর্থন লিবিয়ার পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



