রাশিয়া তার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত রাতের প্রায় তিন ঘণ্টার মধ্যে ১১১টি ইউক্রেনীয় ড্রোন শনাক্ত করে ভূপাতিত করেছে। এ ঘটনার মধ্যে আটটি ড্রোন মস্কোর আকাশে ধ্বংস করা হয়েছে। একই সময়ে, কিয়েভে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আক্রমণ ঘটায়, যার ফলে দুইজন নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং শহরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছয়টি অঞ্চলে একসাথে কাজ করে ১১১টি ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করেছে। মস্কোর আকাশে আটটি ড্রোন ধ্বংসের তথ্য বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা তুলে ধরে।
মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিনের মতে, অতিরিক্তভাবে শহরের দিকে আসার পথে আরও এগারোটি ড্রোন গুলি করে নামানো হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই পদক্ষেপগুলো শহরের নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় নেওয়া হয়েছে।
রাশিয়ার এই আক্রমণটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কির মধ্যে শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত করার বৈঠকের আগের রাতে ঘটেছে। দুই নেতা কিয়েভে একত্রিত হয়ে আলোচনার শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, যখন রাশিয়া হঠাৎ করে সামরিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।
কিয়েভের ডোনিপ্রোভস্কি জেলায় ৭১ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিহত হন, আর পার্শ্ববর্তী বিল্লা সেরকভা শহরে আরেকজনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। কিয়েভে মোট ৩২ জন আহত হয়েছে, যার মধ্যে দুইজন শিশুও অন্তর্ভুক্ত। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মতে, আহতদের মধ্যে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্তদের তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
হামলার ফলে কিয়েভের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, যা রাতের বেলা শহরের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধারের কাজ চলমান, তবে সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধার কয়েক ঘণ্টা সময় নিতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
স্থানীয় সময় শনিবার ভোর থেকে প্রায় দশ ঘণ্টা জুড়ে কিয়েভে বিমান হামলার সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। এই সময়ে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আক্রমণ শহরের বিভিন্ন অংশে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। সতর্কতা বাতিলের পরেও, নিরাপত্তা বাহিনীর তীব্র পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, ট্রাম্প-জেলেনস্কি বৈঠকের আগে রাশিয়ার এই আক্রমণকে কূটনৈতিক সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র উল্লেখ করেছেন, রাশিয়ার এই পদক্ষেপ শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিশ্লেষকরা রাশিয়ার কৌশলকে “সময়ভিত্তিক চাপ” হিসেবে মূল্যায়ন করছেন, যেখানে শীর্ষ স্তরের আলোচনার আগে সামরিক কার্যক্রম বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে আলোচনায় কমজোরি করা হয়। এক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের মতে, রাশিয়া এই ধরনের আক্রমণকে আলোচনার টেবিলে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার একটি উপায় হিসেবে ব্যবহার করছে।
রাশিয়ার পূর্ববর্তী ড্রোন ধ্বংসের দাবিগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে, নভেম্বরের শেষের দিকে রাশিয়া ৯৮টি ড্রোন ভূপাতিতের দাবি করেছিল। বর্তমান ঘটনার পরিসর ও সময়সীমা দেখায়, রাশিয়া সামরিক প্রতিক্রিয়ার গতি বাড়িয়ে চলেছে, যা ভবিষ্যতে আরও তীব্র সংঘাতের ইঙ্গিত দিতে পারে।
পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনার সূচি নির্ধারিত হয়েছে, এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এই বিষয়টি নিয়ে বিশেষ সেশনের আহ্বান জানানো হতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা, উভয় পক্ষের মধ্যে শীতলতা বজায় রেখে শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত করা।
সারসংক্ষেপে, রাশিয়ার সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ কিয়েভে প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি ঘটিয়েছে, পাশাপাশি শীর্ষ কূটনৈতিক আলোচনার সময়কে প্রভাবিত করেছে। এই পরিস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করছে।



