আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর (জামায়াত) মধ্যে জোট গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে পার্টির অভ্যন্তরে তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন শনি রাতের পোস্টে উল্লেখ করেন, সংস্কার ও রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠনের প্রশ্নে জামায়াতসহ কয়েকটি দলের সঙ্গে এনসিপির মতের সাদৃশ্য দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশনে সংস্কার সংক্রান্ত আলোচনায় বিএনপির সঙ্গে পার্থক্য থাকলেও, এনসিপি, জামায়াত এবং অন্যান্য দল স্বাভাবিকভাবেই একমত হয়।
হোসেনের মতে, দেশের নতুন কাঠামো গঠন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন, সেটিই জোট বা সমঝোতার মূল মানদণ্ড। তিনি জোর দেন, নির্বাচনী জোটের ক্ষেত্রে এই দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া অন্য কোনো বিষয়কে প্রধান বিবেচনা করা যায় না।
জাতীয় নাগরিক পার্টি ও জামায়াতের জোটের আলোচনা এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানানো হচ্ছে, এবং কোনো সময় আনুষ্ঠানিক ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সম্ভাব্য জোটের খবরের পরই পার্টির অভ্যন্তরে বিরোধের স্রোত তীব্রতর হয়েছে। শনি রাতে কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তত ত্রিশজন নেতা নাহিদ ইসলামের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেন, যেখানে তারা এই সমঝোতার বিরোধিতা প্রকাশ করে।
বিরোধের শীর্ষে দাঁড়ায় এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা, যিনি দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তাসনিম জারা ঢাকা‑৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। তার পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে পার্টির অন্যান্য কয়েকজন নেত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট করে দলের অভ্যন্তরীণ অস্বস্তি প্রকাশ করেন।
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির মোট ২১৪ সদস্যের মধ্যে ১৮৪ জন জোটের পক্ষে মত দেন। অন্যদিকে, সমঝোতার তীব্র বিরোধিতা করে ৩০ জন শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলামের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেন। চিঠিতে তারা এই উদ্যোগকে ‘জাতির সঙ্গে …’ বলে সমালোচনা করে, যদিও পুরো বাক্যটি প্রকাশিত হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে এনসিপি ও জামায়াতের জোটের সম্ভাবনা কীভাবে এগোবে, তা এখনো অনিশ্চিত। পার্টির অভ্যন্তরে সমর্থক ও বিরোধীর সংখ্যা স্পষ্ট, তবে সমঝোতার শর্ত ও নীতিমালা এখনও আলোচনার বিষয়। যদি জোট চূড়ান্ত হয়, তবে তা নির্বাচনী গতি-প্রকৃতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে, বিশেষ করে উভয় পার্টির ভোটভিত্তি ও প্রভাবকে একত্রিত করে।
অন্যদিকে, তাসনিম জারার স্বতন্ত্র প্রার্থিতার ঘোষণা এনসিপির জন্য একটি নতুন দিক নির্দেশ করে। তার প্রার্থীতা পার্টির ঐতিহ্যবাহী সমর্থনভিত্তিকে ভাগ করে নিতে পারে, যা জোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। তাছাড়া, বিরোধী নেতাদের প্রকাশ্য বিরোধ পার্টির ঐক্যবদ্ধ চিত্রকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে, যা ভোটারদের কাছে পার্টির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, যদি এনসিপি ও জামায়াতের জোট শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়, তবে তা নির্বাচনী মঞ্চে নতুন গতি সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পার্টির অভ্যন্তরে বিদ্যমান মতবিরোধ ও নেতৃত্বের পরিবর্তনগুলোকে কীভাবে সামলানো হবে, তা জোটের টেকসইতা নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি হবে।
এখন পর্যন্ত পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির অধিকাংশ সদস্য জোটের পক্ষে হলেও, বিরোধী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা ও তাসনিম জারার স্বতন্ত্র প্রার্থিতার প্রভাব ভবিষ্যতে কী রকম ফলাফল দেবে, তা সময়ই বলবে। নির্বাচনের দিন নিকটবর্তী হওয়ায় উভয় পার্টি তাদের কৌশল নির্ধারণে ত্বরান্বিত হচ্ছে, এবং ভোটারদের কাছে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে বিভিন্ন প্রচারমূলক কার্যক্রম চালু করতে পারে।
এই জোটের সম্ভাব্য ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট নতুন রূপ নিতে পারে, যেখানে এনসিপি ও জামায়াতের সমন্বিত শক্তি ভোটের ভারসাম্যকে পরিবর্তন করতে পারে। তবে পার্টির অভ্যন্তরীণ সমন্বয়, নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা এবং ভোটারদের গ্রহণযোগ্যতা জোটের সাফল্যের মূল নির্ধারক হবে।



