চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলার নন্দীরহাট গ্রামে অবস্থিত ১৩৫ বছর পুরোনো জমিদারবাড়িতে সম্প্রতি নায়করাজ্জাকের ‘অশিক্ষিত’ চলচ্চিত্রের শুটিং শেষ হয়েছে। ঐতিহাসিক এই সম্পত্তি, যা একসময় আড়ম্বর ও সমৃদ্ধির প্রতীক ছিল, এখন চলচ্চিত্রের পটভূমি হিসেবে নতুন দর্শককে আকর্ষণ করছে।
দুইটি গম্বুজের ছায়া ও বিশাল কাঠের ছাদ, সূক্ষ্ম নকশার কার্নিশ এবং জটিল খোদাইযুক্ত দেয়াল এই বাড়িকে আলাদা করে তুলেছে। দোতলা কাচারিঘর, বিগ্রহ মন্দির, দুটি আলাদা দালান এবং শানবাঁধানো পুকুর একত্রে একটি সম্পূর্ণ জীবনকেন্দ্র গঠন করেছিল, যা আজও তার শৈল্পিক গৌরবের ছাপ বহন করে।
বাড়িটি ১৮৯০ সালে জমিদার লক্ষ্মী চরণ সাহা পাঁচ একর জমিতে নির্মাণ করেন। তিনি, মাদল সাহা ও নিশিকান্ত সাহার সহযোগিতায় নন্দীরহাটে জমিদারি প্রথার সূচনা করেন। লক্ষ্মী চরণ সাহার বড় ছেলে প্রসন্ন সাহা, জমিদারি বিলুপ্তির আগে পর্যন্ত এই সম্পত্তির দেখভাল করেন এবং পরে এটি বিখ্যাত সুরকার ও গীতিকার সত্য সাহার পৈতৃক বাড়ি নামে পরিচিতি পায়।
ব্রিটিশ শাসনকালে নন্দীরহাটকে ‘মন্দিরের গ্রাম’ বলা হতো; এখানে একাধিক রাজবাড়ি ও মন্দিরের সমাবেশ ছিল। এ পরিবেশে সত্য সাহার পরিবারিক বাড়িটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে বিশেষ গুরুত্ব পায়। আজও ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকরা এই স্থানে আসেন, যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাঠামো ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির বিশাল উঠানে কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ নারী চেয়ারে বসে গল্পে মেতে উঠেছেন। তাদের স্বাগতপূর্ণ হাসি ও উষ্ণ অভ্যর্থনা দর্শকদের মনকে স্পর্শ করে। সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ রমা সাহা, ৮৪ বছর বয়সী, মাত্র সতেরো বছর বয়সে এই বাড়িতে বউ হয়ে আসেন। তিনি স্মরণ করেন, এক সময় এখানে বারো মাসে তেরো পার্বণ অনুষ্ঠিত হতো, যেখানে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা একত্রিত হয়ে পাটি বিছিয়ে খাবার পরিবেশন করতেন।
সেই উজ্জ্বল দিনগুলো এখন অতীতের স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রমা সাহার বর্ণনা অনুযায়ী, বাড়ির উঠানটি কখনো বিশাল ভোজের আয়োজক ছিল, যেখানে সারা গ্রাম থেকে মানুষ আসত। পার্বণগুলোতে সঙ্গীত, নৃত্য ও খাবারের সমারোহে গ্রামবাসীর আনন্দের সীমা ছিল না। আজ এই উল্লাসের প্রতিধ্বনি শূন্য, এবং বাড়ির বেশিরভাগ অংশই ভেঙে পড়ার পথে।
স্থাপত্যগত দিক থেকে বাড়িটি দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত। সামনের দালানটি দোতলা, যার সঙ্গে বিশাল লোহার ফটক যুক্ত। ফটক পার হয়ে ডান পাশে কাচারিঘর অবস্থিত, যেখানে একসময় প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা সংগ্রহ করা হতো। বাম দিকে দোতলার সিঁড়ি-কারুকার্যখচিত কাঠের কাজ এবং নকশা করা দরজা-জানালা বাড়ির ঐতিহ্যবাহী শৈলীকে প্রকাশ করে।
বড়ো মন্দির, পুরনো কাঁচের জানালা এবং ভাঙা ছাদ এখনো ঐতিহাসিক গৌরবের চিহ্ন বহন করে, তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে ধ্বংসের পথে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও সংস্কৃতি সংস্থাগুলি ভবিষ্যতে এই ঐতিহ্যবাহী সম্পত্তি সংরক্ষণে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই স্থাপত্যের সৌন্দর্য ও ইতিহাস উপভোগ করতে পারে।
‘অশিক্ষিত’ ছবির শুটিংয়ের মাধ্যমে এই জমিদারবাড়ি আবারো মিডিয়ার আলোতে এসেছে। চলচ্চিত্রের দৃশ্যগুলোতে দেখা যায়, বাড়ির বিশাল আঙিনায় গাছের ছায়া, পুরনো কাঠের দরজা এবং ভাঙা ফটক—সবই সিনেমার পটভূমি হিসেবে কাজ করেছে। এই নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বাড়ির সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক মূল্য পুনরায় উদ্ভাসিত হয়েছে, যা স্থানীয় মানুষ ও দর্শকদের মধ্যে পুনরায় সংরক্ষণে আগ্রহ জাগিয়ে তুলেছে।



