শনি রাত ২৭ ডিসেম্বর, রাত প্রায় ১১টায় কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত এলাকায় তীব্র বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। শব্দটি প্রায় তিন থেকে চার মিনিটের ব্যবধানে একাধিকবার পুনরাবৃত্তি হয়, যা স্থানীয় গ্রামগুলোতে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
কক্সবাজারের হোয়াইক্যং, পালংখালী, রাজাপালং, ঘুমধুমসহ অন্তত পনেরোটি গ্রামবাসী এই অস্বাভাবিক শব্দের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন। কিছু বাসিন্দা জানান, শব্দের তীব্রতা এমন যে তারা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আশেপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করেন। পালংখালীর রহমতের বিলের বাসিন্দা বোরহান উদ্দিন বলেন, শব্দটি হঠাৎ বজ্রপাতের মতো শোনায় এবং প্রথমে তা গুলির শব্দের মতো মনে হয়নি। কুতুপালংয়ের হৃদয় চৌধুরী উল্লেখ করেন, শব্দের ফলে মাটি কাঁপতে শুরু করে, যেন ভূমিকম্প ঘটেছে।
রোহিঙ্গা শিবিরেও একই ধরনের বিস্ফোরণ অনুভূত হয়েছে। শিবিরের একজন চিত্রগ্রাহক সামাজিক মাধ্যমে জানান, মিয়ানমার জান্তা বাহিনী উত্তর মংডু অঞ্চলে বিমান হামলা চালিয়েছে, যার শব্দ বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছেছে। একই সময়ে, মংডু ডেইলি নিউজ ও আরকান আপডেটের তথ্য অনুযায়ী, রাত ১১টা ২০ মিনিটে জান্তা বাহিনীর এসএসএ যুদ্ধবিমান উত্তর মংডুর কিয়াও চাউং ডিভিশন ও গান চাউং ব্যাটালিয়নে কমপক্ষে তিন দফা গোলাবর্ষণ চালায়। আকাশে একটি ওয়াই-১২ মডেল বিমানও দেখা গিয়েছে।
এই অঞ্চলে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে জান্তা সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত চলছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে আরাকান আর্মি উত্তর মংডুতে ২৭১ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, একই বছরের নভেম্বর পর্যন্ত চলমান সংঘাতের ফলে প্রায় এক লাখ আট হাজার রোহিঙ্গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে শরণার্থী হিসেবে প্রবেশ করেছে।
বাংলাদেশ গার্ডের উখিয়া ব্যাটালিয়ন (৬৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জসীম উদ্দিন জানান, রাত ১০টা ৩৮ মিনিট থেকে ১০টা ৫৫ মিনিটের মধ্যে শূন্যরেখা থেকে ১৩ কিলোমিটার ভেতরে মিয়ানমারের বলিবাজার এলাকায় বোমা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছে। তিনি যোগ করেন, মিয়ানমার বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান তিন দফা বোমা নিক্ষেপ করেছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের ক্রস-সীমানা শোরগোল উভয় দেশের সীমান্ত রক্ষার ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারা বলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক সংলাপের প্রেক্ষিতে, এই ঘটনা দুই দেশের নিরাপত্তা সমঝোতা ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে তুলেছে।
অ্যাসিয়ান গোষ্ঠীর সদস্য দেশগুলো ইতিমধ্যে মিয়ানমার সংঘাতের সমাধানে মধ্যস্থতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তবে, বিশ্লেষকরা সতর্ক করেন, সীমান্তে বোমা হামলার পুনরাবৃত্তি আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর জন্য উদ্বেগের বিষয়, বিশেষ করে রোহিঙ্গা শিবিরের নিরাপত্তা ও শরণার্থীদের পুনর্বাসন পরিকল্পনা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনার পর মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে জরুরি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের মতে, উভয় দেশের নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বয় বাড়িয়ে সীমান্তে অপ্রত্যাশিত সামরিক কার্যক্রমের পূর্বাভাস ও প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে।
অন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই ঘটনাকে মিয়ানমার অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বিস্তার এবং সীমান্তবর্তী দেশগুলোর নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। তারা জোর দিয়ে বলেন, দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য রাজনৈতিক সংলাপ, মানবিক সহায়তা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন।
এই বিস্ফোরণ শোরগোলের পর, কক্সবাজারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী অতিরিক্ত সতর্কতা বজায় রাখবে এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিবেশী দেশগুলোকে এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে সমন্বিত প্রতিক্রিয়া জানাতে আহ্বান জানানো হয়েছে।



