পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রথম ও একমাত্র নারী গভর্নর শামশাদ আখতার (৭১) গত শনিবার দেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের জানানো তথ্য অনুযায়ী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তিনি দুইবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন, যা দেশের আর্থিক নীতি নির্ধারণে তার প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করেছে।
গভর্নর পদে ২০১৪ সালে নিযুক্ত হওয়ার পর থেকে আখতার মুদ্রা নীতি, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং পুঁজিবাজারের সংযোগস্থলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার সমন্বয়, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেছে।
মৃত্যুর পূর্বে তিনি পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এই পদে থাকাকালীন তিনি শেয়ারবাজারের স্বচ্ছতা বাড়াতে, তালিকাভুক্ত কোম্পানির শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করতে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীর আস্থা জোগাতে বেশ কিছু সংস্কার চালু করেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আওরঙ্গজেবের মতে, আখতার দেশের সর্বোচ্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। তিনি আর্থিক সেক্টরের স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখেছিলেন, যা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করেছে।
স্থানীয় মিডিয়ার প্রতিবেদন অনুসারে, আখতার হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং তার স্বাস্থ্যের অবনতি কয়েক মাস আগে থেকেই লক্ষ্য করা গিয়েছিল। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত তার দায়িত্ব থেকে সরে না গিয়ে, স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করে চলেছিলেন।
আখতার আন্তর্জাতিক আর্থিক ক্ষেত্রেও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং জাতিসংঘের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইউএন ইএসক্যাপ) নির্বাহী সচিবসহ বহু উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক নীতি গঠনে বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ যুক্ত করতে সক্ষম করেছে।
এর আগে তিনি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকে কাজ করেছেন, যেখানে তিনি অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থায়ন ও উন্নয়ন নীতি নিয়ে কাজের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তার বহুমুখী অভিজ্ঞতা দেশীয় আর্থিক সংস্থার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বয়কে সহজতর করেছে।
শামশাদ আখতার হায়দরাবাদে জন্মগ্রহণ করেন এবং তার শিক্ষা জীবনের বেশিরভাগ অংশ পাকিস্তান ও যুক্তরাজ্যে গড়ে উঠেছে। তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়, কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স এবং যুক্তরাজ্যের পেইসলি কলেজ অব টেকনোলজি থেকে ডিগ্রি অর্জন করেন। এই বহুমুখী শিক্ষাগত পটভূমি তাকে আর্থিক নীতি ও বাজার বিশ্লেষণে বৈশ্বিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেছে।
আখতারের অকাল প্রস্থান দেশের আর্থিক ব্যবস্থার জন্য একটি বড় শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রা নীতি এবং স্টক এক্সচেঞ্জের নেতৃত্বে তার অভিজ্ঞতা হারিয়ে যাওয়ায় স্বল্পমেয়াদে নীতি ধারাবাহিকতা ও বাজারের স্বচ্ছতায় প্রভাব পড়তে পারে। বিনিয়োগকারীরা তার প্রস্থানকে একটি অনিশ্চয়তার সূচক হিসেবে দেখতে পারেন, যা পোর্টফোলিও পুনর্বিন্যাস ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশলে পরিবর্তন আনতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্রুত একটি উত্তরাধিকারী নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। নতুন গভর্নরের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক নীতি বিশেষজ্ঞদের মতামত বিবেচনা করা হবে, যাতে মুদ্রা স্থিতিশীলতা ও বাজারের আস্থা বজায় থাকে। এই সময়ে সরকারকে স্বচ্ছতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে বাজারের অস্থিরতা কমাতে হবে।
সংক্ষেপে, শামশাদ আখতারের মৃত্যু পাকিস্তানের আর্থিক সেক্টরে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করে। তার দীর্ঘমেয়াদী নীতি ও আন্তর্জাতিক সংযোগের অভাব স্বল্পমেয়াদে বাজারের অস্থিরতা বাড়াতে পারে, তবে দ্রুত এবং দক্ষ উত্তরাধিকারী নির্বাচন দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে। ভবিষ্যতে মুদ্রা নীতি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পুঁজিবাজারের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে নতুন নেতৃত্বের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ হবে।



