ইরানের বিশিষ্ট চলচ্চিত্র ও থিয়েটার লেখক-নির্দেশক বাহরাম বেজাইয়ে, ৮৭ বছর বয়সে, যুক্তরাষ্ট্রে শুক্রবার তার জন্মদিনে ক্যান্সার জটিলতার কারণে মৃত্যুবরণ করেন। তার শেষ দিনগুলোতে তিনি একই দিনে জন্মদিন উদযাপন করছিলেন, যা তার জীবনের শেষ অধ্যায়কে চিহ্নিত করে।
বেজাইয়ের ১৯৮৫ সালের চলচ্চিত্র ‘বাশু, দ্য লিটল স্ট্রেঞ্জার’ ২০২৫ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পুনরুদ্ধারকৃত সংস্করণে প্রদর্শিত হয় এবং ভেনিস ক্লাসিক্স পুরস্কার থেকে সর্বোত্তম পুনরুদ্ধারকৃত চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি পায়। এই স্বীকৃতি তার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র জগতের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে।
ইরানের অস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক আসগার ফারহাদি, বেজাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি বার্তা প্রকাশ করেন। তিনি বেজাইয়ের কাজ, শব্দ এবং দেশের সংস্কৃতির প্রতি তার অটুট ভালোবাসাকে “মহান শিক্ষক” হিসেবে বর্ণনা করেন এবং উল্লেখ করেন যে বেজাইয়ে তার জীবনের শেষ দিনগুলোতে বিদেশে বসবাস করেও তিনি ইরানের প্রকৃত পরিচয়কে সর্বদা বজায় রেখেছেন। ফারহাদি তার বার্তায় বেজাইয়ের ইরানি পরিচয়কে “সবচেয়ে ইরানি ইরানি” হিসেবে প্রশংসা করেন।
বাহরাম বেজাইয়ে ২৬ ডিসেম্বর ১৯৩৮ সালে তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কবি ও সাহিত্য পণ্ডিতদের সমৃদ্ধ পরিবারে বেড়ে ওঠেন, যা তার সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তার ক্যারিয়ার জুড়ে তিনি দশটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, চারটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং চৌদ্দটি নাটক পরিচালনা করেছেন। এছাড়া, তিনি সত্তরটিরও বেশি বই, গবেষণাপত্র, নাটক ও চিত্রনাট্য রচনা করেছেন, যা ইরানি সংস্কৃতি ও শিল্পের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।
ইরানি নতুন তরঙ্গের অন্যতম পথপ্রদর্শক হিসেবে বেজাইয়ের কাজ বিশ্বব্যাপী চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত হয়েছে। ‘বাশু’ ছাড়াও তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ১৯৭২ সালের ‘ডাউনপাওয়ার’ এবং ২০০১ সালের ‘কিলিং র্যাবিডস’ অন্তর্ভুক্ত। তার সৃষ্টিগুলো ইন্দো-ইরানি পুরাণ, ইতিহাস এবং প্রাচীন ইরানি সাহিত্য ও ভাষার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা তাকে এক অনন্য শৈলীর ধারক করে তুলেছে।
বেজাইয়ে ইরানি থিয়েটারের স্বদেশীয় রূপ পুনর্গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তার প্রথম নাটক ‘আরাশ’, যা তিনি উনিশ বছর বয়সে রচনা করেন, সিয়াভাশ কাসরায়ের ‘আরাশ দ্য আর্চার’ এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে তৈরি হয়। এই কাজটি তার শৈল্পিক আত্মবিশ্বাসের সূচনা চিহ্নিত করে এবং ইরানি নাট্য সংস্কৃতির পুনর্জাগরণে তার ভূমিকা স্পষ্ট করে।
বেজাইয়ের গবেষণামূলক কাজগুলোও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ‘হাজার ও এক রাতের’ উত্স এবং এর পারসীয় সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্ক বিশ্লেষণকারী একাধিক পাণ্ডুলিপি রচনা করেছেন। তার মনোগ্রাফ ও প্রবন্ধগুলো প্রাচীন ইরানি সাহিত্যিক ঐতিহ্যের গভীরতা উন্মোচন করে এবং আধুনিক গবেষকদের জন্য মূল্যবান রেফারেন্স হিসেবে কাজ করে।
বেজাইয়ের মৃত্যু ইরানি চলচ্চিত্র ও থিয়েটার জগতে একটি বড় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তার সৃষ্টিশীল দৃষ্টিভঙ্গি, সাংস্কৃতিক গবেষণা এবং শিক্ষাদানের মাধ্যমে তিনি বহু তরুণ শিল্পীকে অনুপ্রাণিত করেছেন। তার অবদানকে স্মরণ করে, ইরান ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সম্প্রদায়ে তার নামের সঙ্গে যুক্ত স্মৃতিচিহ্ন ও পুরস্কারগুলো ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।
বেজাইয়ের জীবনের শেষ অধ্যায়ে, তিনি বিদেশে বসবাসের পরেও ইরানের সংস্কৃতি ও শিল্পের প্রতি তার অটুট ভালোবাসা বজায় রেখেছেন। তার মৃত্যু তার জন্মদিনের সঙ্গে মিলিয়ে তার জীবনের একটি অনন্য সমাপ্তি চিহ্নিত করে, যা তার পরিবার, বন্ধু এবং সমগ্র শিল্প জগতের জন্য গভীর শোকের কারণ।
বাহরাম বেজাইয়ের স্মৃতি ও সৃষ্টিগুলো ইরানি সংস্কৃতির অমলিন ধন হিসেবে রয়ে যাবে, এবং তার কাজের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পী ও গবেষকরা নতুন দিগন্তের সন্ধান করবে।



