দক্ষিণ কোরিয়ার একটি গবেষণা দল সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্লেষণে দেখিয়েছে যে ডার্ক এনার্জি নামে পরিচিত অজানা শক্তি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনশীল হতে পারে, যা মহাবিশ্বের বিস্তারকে থামিয়ে পুনরায় সংকোচনের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই ফলাফলটি পূর্বের ধারণার বিপরীতে, যেখানে ডার্ক এনার্জি মহাবিশ্বকে ক্রমাগত দ্রুততর করে চলার কথা ধরা হয়েছিল।
ডার্ক এনার্জি প্রথমবারের মতো ১৯৯৮ সালে সুপারনোভা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয়। দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর আলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তারা প্রত্যাশিত ধীরগতির পরিবর্তে ত্বরান্বিতভাবে দূরে সরে যাচ্ছে। এই পর্যবেক্ষণই ডার্ক এনার্জি নামে একটি ত্বরান্বিতকারী শক্তির অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়।
এরপরের তত্ত্বগুলোতে মহাবিশ্বের শেষের সম্ভাব্য দৃশ্যপট হিসেবে “বিগ রিপ” এবং “বিগ ক্রাঞ্চ” উল্লেখ করা হয়েছে। বিগ রিপে ডার্ক এনার্জি অনির্দিষ্টভাবে শক্তিশালী হয়ে গ্যালাক্সি, তারকা এবং শেষ পর্যন্ত পরমাণু পর্যন্ত ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় বলে ধারণা করা হয়। অন্যদিকে বিগ ক্রাঞ্চে মহাবিশ্বের বিস্তার ধীরে ধীরে থেমে গিয়ে মহাকর্ষের প্রভাবের অধীনে পুনরায় সংকুচিত হয়ে শেষ হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষকরা যে নতুন তথ্য উপস্থাপন করেছেন, তা আরজোনার মরুভূমিতে অবস্থিত ডার্ক এনার্জি স্পেকট্রোস্কোপিক ইনস্ট্রুমেন্ট (DESI) থেকে প্রাপ্ত ডেটার উপর ভিত্তি করে। DESI লক্ষ লক্ষ গ্যালাক্সির গতি ও অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে মাপতে সক্ষম, এবং এই বিশাল ডেটাসেটের বিশ্লেষণে দেখা গেছে গ্যালাক্সিগুলোর ত্বরান্বিত বিস্তার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস পাচ্ছে।
DESI প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি ও তার প্রভাব সম্পর্কে গভীর ধারণা অর্জন করা। মিশ্রিত স্পেকট্রাল ডেটা এবং রেডশিফট পরিমাপের মাধ্যমে গবেষকরা গ্যালাক্সির দূরত্ব ও গতি নির্ণয় করেন, যা মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার নিরূপণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই পর্যবেক্ষণগুলো পূর্বাভাসের চেয়ে ভিন্ন প্রবণতা দেখিয়েছে, যা ত্বরান্বিত বিস্তার ধীর হয়ে যাচ্ছে ইঙ্গিত করে।
যদি ত্বরান্বিত বিস্তার সত্যিই হ্রাস পায়, তবে মহাকর্ষের প্রভাব ধীরে ধীরে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। সেই মুহূর্তে গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের দিকে টান নিতে শুরু করবে, এবং দীর্ঘমেয়াদে মহাবিশ্ব সংকোচনের দিকে অগ্রসর হতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে বিজ্ঞানীরা “বিগ ক্রাঞ্চ” নামে অভিহিত করে, যেখানে শেষ পর্যন্ত সব গ্যালাক্সি একত্রে মিলিত হয়ে একটি ঘন অবস্থা গঠন করবে।
বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ফলাফলের প্রতি মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানী নতুন ডেটার যথার্থতা ও ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তবে এখনো কোনো স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান করা যায়নি। একই সঙ্গে, অন্যান্য পর্যবেক্ষণ এখনও ডার্ক এনার্জির ত্বরান্বিত প্রভাবকে সমর্থন করে, ফলে বর্তমান ডেটা ও পূর্বের ফলাফলের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ দেখা দিচ্ছে।
এই ধরনের বৈপরীত্য মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। যদি ডার্ক এনার্জি সত্যিই পরিবর্তনশীল হয়, তবে বর্তমান কোসমোলজিক্যাল মডেলগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংশোধন আনা লাগবে। তাছাড়া, মহাবিশ্বের চূড়ান্ত গন্তব্য—বিগ রিপ, বিগ ক্রাঞ্চ, নাকি অনন্ত বিস্তার—নির্ধারণে এই নতুন তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বর্তমান ফলাফলগুলো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং অতিরিক্ত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। DESI-এর পরবর্তী ডেটা রিলিজ এবং অন্যান্য মহাজাগতিক জরিপের ফলাফল একত্রে এই তত্ত্বকে শক্তিশালী বা খণ্ডন করতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা ডার্ক এনার্জির আচরণকে আরও সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সাধারণ পাঠকদের জন্য এই বিষয়টি জটিল শোনালেও, মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানার প্রচেষ্টা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়, তবে এটি মানবজাতির জ্ঞান অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিজ্ঞানীরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে, সাধারণ মানুষ এই ধরনের গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত থাকুক এবং বিজ্ঞানী সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিক।
অবশেষে, ডার্ক এনার্জি কীভাবে বিকশিত হবে এবং মহাবিশ্বের শেষের দৃশ্য কী হবে, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে চলমান গবেষণা ও নতুন ডেটা আমাদেরকে এই বিশাল রহস্যের কাছাকাছি নিয়ে যাবে। আপনি কি মনে করেন, ভবিষ্যতে কোন তত্ত্বই শেষ পর্যন্ত সত্যি প্রমাণিত হবে?



