বাংলাদেশের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বঙ্গোপসাগরে তেল‑গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ২০২৫ মডেল উৎপাদন‑বণ্টন চুক্তি (PSC) পুনর্বিবেচনা করার নির্দেশ দিয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি নয়জন সদস্যের পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তাদেরকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এই পদক্ষেপটি পূর্বে সরকারী দরপত্রের প্রতি আন্তর্জাতিক কোম্পানির সাড়া না পাওয়ার পর, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গৃহীত করেছে।
কমিটির কাজের জন্য পেট্রোবাংলাকে প্রশাসনিক ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করতে বলা হয়েছে। কমিটির প্রধান দায়িত্ব হল খসড়া PSC‑এর নতুন বিধানগুলোকে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা এবং সংশোধনের জন্য সুপারিশ উপস্থাপন করা। এই সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার চুক্তির চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণ করবে।
কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত সদস্যরা হলেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ভিসি অধ্যাপক ড. এম তামিম, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান আবুল মনির মো. ফয়েজ উল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এস এম মাইকেল কবির, সুপ্রিম কোর্টের ব্যারিস্টার ও আইনজীবী ড. সিনথিয়া ফরিদ, পেট্রোবাংলার PSC প্রকৌশলী পরিচালক মো. শোয়েব, কন্ট্রাক্টসের মহাব্যবস্থাপক হাসান মাহমুদুল ইসলাম, রিজার্ভার ও ডাটা ম্যানেজমেন্টের মহাব্যবস্থাপক মেহেরুল হাসান এবং এক্সপ্লোরেশনের মহাব্যবস্থাপক ফারহানা শাওন (সদস্যসচিব)।
কমিটি যে মূল পরিবর্তনগুলো বিবেচনা করছে, তার মধ্যে গ্যাসের বিক্রয়মূল্যকে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের সঙ্গে যুক্ত করা অন্যতম। পূর্বে গ্যাসের দাম হাইড্রোকার্বন সলভেন্ট ফুয়েল অয়েল (HSFO) ভিত্তিক ছিল, যা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নতুন মডেলে গ্যাসের মূল্য আন্তর্জাতিক তেল মূল্যের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হবে, ফলে মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সমন্বয় সম্ভব হবে।
পেমেন্ট পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হবে; লিবর (LIBOR) ভিত্তিক সুদের হার বাদ দিয়ে, সাফার (SOFR) ব্যবহার করা হবে। এই পরিবর্তনটি বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের বর্তমান প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ঝুঁকি হ্রাসে সহায়ক বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়াও ডাটার মূল্য, কর্মী বোনাস এবং খরচ পুনরুদ্ধার (কস্ট রিকভারি) শর্তে সংশোধন আনা হবে, যাতে বহুজাতিক অংশীদারদের জন্য আর্থিক শর্তগুলো আরও আকর্ষণীয় হয়।
এই সংস্কারগুলো আন্তর্জাতিক তেল‑গ্যাস সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে লক্ষ্যযুক্ত। গ্যাস বিক্রয়ের মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক যুক্ত করা, পেমেন্টের সূচক পরিবর্তন এবং খরচ পুনরুদ্ধারের শর্তে নমনীয়তা প্রদান করা, সবই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি কমিয়ে আনে এবং রিটার্নের সম্ভাবনা বাড়ায়। ফলে বঙ্গোপসাগরের অনুসন্ধান প্রকল্পগুলোতে নতুন মূলধন প্রবাহের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।
এ পর্যন্ত প্রকাশ্য সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এক্সনমোবিল ও শেভরন, মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস, নরওয়ে‑ফ্রান্সের যৌথ উদ্যোগ টিজিএস অ্যান্ড স্লামবার্জার, জাপানের ইনপেক্স কর্পোরেশন, জাপানের জোগম্যাক এবং চীনের সিনুয়েট ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারেস্ট দেখাচ্ছে। এই কোম্পানিগুলো পূর্বে বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধান প্রকল্পে অংশগ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, তবে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের আগে সংশোধিত PSC‑এর শর্তগুলো মেনে নিতে হবে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, সংশোধিত চুক্তি যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তেল‑গ্যাস সেক্টরে নতুন প্রকল্পের সূচনা এবং বিদ্যমান ক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গ্যাসের মূল্য আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি করতে পারে। তবে শর্তের কঠোরতা ও পরিবেশগত নিয়মাবলীর প্রয়োগে অতিরিক্ত নজরদারি প্রয়োজন, যাতে প্রকল্পের টেকসইতা নিশ্চিত হয়।
কমিটি ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তাদের বিশ্লেষণ ও সুপারিশ জমা দিলে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দ্রুত সংশোধিত PSC‑এর খসড়া প্রস্তুত করবে এবং তা সরকারী অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করবে। অনুমোদনের পর, নতুন চুক্তি ভিত্তিক টেন্ডার প্রক্রিয়া চালু হবে, যা আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য আবেদন করার শেষ তারিখ নির্ধারণ করবে।
বঙ্গোপসাগরের তেল‑গ্যাস অনুসন্ধানকে পুনরুজ্জীবিত করার এই উদ্যোগটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। সংশোধিত চুক্তির শর্তগুলো যদি বাজারের প্রত্যাশা পূরণ করে, তবে আগামী কয়েক বছরে বিদেশি মূলধন প্রবাহ এবং উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের জ্বালানি পোর্টফোলিওতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।



