চট্টগ্রাম বন্দর, যা দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি পরিচালনা করে, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, শ্রমিকের অশান্তি এবং নীতি পরিবর্তনের ধারাবাহিক সংঘর্ষের মুখে পড়ে। বছরের শুরু থেকেই প্রতিবাদ, ট্যারিফ বৃদ্ধি এবং প্রধান টার্মিনালগুলোকে বিদেশি সংস্থার হাতে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত বন্দরকে জাতীয় দৃষ্টির কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
দশমি ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্দর ৩৩.৬৪ লাখ টিইউ (২০ ফুট সমমানের ইউনিট) কন্টেইনার পরিচালনা করে, যা পূর্ববছরের ৩২.২৭ লাখ টিইউ থেকে ২.৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি। একই সময়ে মোট পণ্যের পরিমাণ ১৩.৬৩ কোটি টন পৌঁছায়, যা গত বছরের সর্বোচ্চ ১২.৪০ কোটি টনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
বন্দরে প্রবেশ করা জাহাজের সংখ্যা ৪,৩৯৬, যা ২০২৪ সালের ৩,৮৬৭ জাহাজের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলো বন্দর পরিচালনা কর্তৃপক্ষের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে।
বছরের প্রথম দিকে অপারেশনাল চাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে ডি.সি. পার্কে প্রাইম মুভার চালক ও সহায়ক কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে কন্টেইনার পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়, যা কয়েক দিন ধরে পণ্য চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এবং শেষ-মাইল লজিস্টিকের দুর্বলতা প্রকাশ করে।
এরপরের মাসে বন্দর কর্তৃপক্ষ কন্টেইনারের ফ্রি পিরিয়ডের পর সংরক্ষণ ফি চারগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই হঠাৎ ট্যারিফ বৃদ্ধি কাস্টমস এজেন্ট ও আমদানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করে, কারণ তারা জানায় যে এই পদক্ষেপ লজিস্টিক খরচ বাড়িয়ে দেবে এবং জ্যাম বাড়াবে, সমস্যার সমাধান নয়।
বছরের মাঝামাঝি সময়ে অপারেশনাল চাপ আরও তীব্র হয়। এপ্রিল ও মে মাসে কন্টেইনার লোডিং ও আনলোডিং প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিক বাধা দেখা দেয়, যা বন্দর কর্মী ও শিপিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে অতিরিক্ত চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই সময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে প্রধান টার্মিনালগুলোকে বিদেশি কোম্পানির হাতে হস্তান্তর করা হয়, যা বাণিজ্যিক কার্যক্রমে নতুন পরিবর্তন আনে এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।
বন্দরের ট্যারিফ বৃদ্ধি এবং অপারেশনাল সমস্যাগুলোকে নিয়ে আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে, কারণ তারা জানায় যে অতিরিক্ত খরচের ফলে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশকে অসুবিধা হতে পারে।
বন্দরের কর্মী সংগঠনগুলোও শ্রমিকের অধিকার ও কাজের শর্ত নিয়ে প্রতিবাদ চালিয়ে যায়, যা বন্দর পরিচালনায় অতিরিক্ত জটিলতা যোগ করে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে এই শ্রমিক আন্দোলনগুলো বাণিজ্যিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।
বছরের শেষ দিকে, ১৯ বছর পর তরিক রহমান তার পিতার সমাধিতে প্রার্থনা করেন, যা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে ধরা পড়ে। এই ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বন্দর সংক্রান্ত ঘটনাগুলোকে আলাদা করে দেখা হলেও, উভয়ই দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিত্রের অংশ।
বন্দর পরিচালনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত বন্দর মোট কন্টেইনার ও পণ্যের পরিমাণে রেকর্ড ভাঙা সাফল্য অর্জন করেছে, তবে অপারেশনাল বাধা ও ট্যারিফ বৃদ্ধির ফলে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক পরিবেশে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দেন যে, বন্দর পরিচালনার নীতি ও ট্যারিফ কাঠামোর পুনর্বিবেচনা, শ্রমিকের সঙ্গে সংলাপ এবং লজিস্টিক অবকাঠামোর উন্নয়ন বাণিজ্যিক প্রবাহকে স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ হবে। এ ধরনের পদক্ষেপ না নেওয়া হলে বন্দর দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হারাতে পারে।



