বাংলাদেশ নৌবাহিনী আগামী ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বর, কক্সবাজার ও হাতিয়ার মাঝের আন্তর্জাতিক সমুদ্র অঞ্চলে মিসাইল ফায়ারিং অনুশীলন করবে। এই দুই দিনের কার্যক্রমের উদ্দেশ্য হল নৌবাহিনীর শ্যুটিং দক্ষতা ও সমুদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা। অনুশীলনের সময় অঞ্চলটি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে, যাতে কোনো বাণিজ্যিক নৌযান বা মাছ ধরার নৌকা দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়।
ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (আইএসপিআর) ২৭ ডিসেম্বর একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে সকল নৌযান, ট্রলার এবং মাছ ধরার নৌকাকে এই নির্দিষ্ট সমুদ্র এলাকায় গমনাগমন থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই সময়ে কোনো বেসামরিক নৌযানকে এলাকায় প্রবেশ করা নিষেধ।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে যে, নৌবাহিনীর মিসাইল ফায়ারিং চলাকালীন সময়ে জাহাজের রাডার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সক্রিয় থাকবে, যাতে কোনো অনিচ্ছাকৃত সংঘর্ষ এড়ানো যায়। নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, অনুশীলনের সময় সব নিরাপত্তা প্রোটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে।
এই ধরনের সামরিক অনুশীলন আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশে স্বাভাবিক অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত ও শ্রীলঙ্কা সহ প্রতিবেশী দেশগুলোও সমুদ্র নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়াতে অনুরূপ মিসাইল ড্রিল পরিচালনা করেছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের ড্রিলগুলি নৌবাহিনীর প্রস্তুতি যাচাইয়ের পাশাপাশি সমুদ্রের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অঞ্চলীয় নিরাপত্তা সংস্থা গুলোর দৃষ্টিতে, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এই অনুশীলন ইন্ডো-প্রশান্তিক সমুদ্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে, বন্দর নগরী কক্সবাজারের নিকটবর্তী এই অঞ্চলটি বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রুট, তাই নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নৌবাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণকে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে।
একজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের মতে, “মিসাইল ফায়ারিং অনুশীলন শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ায় না, বরং আঞ্চলিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তুলতে সহায়তা করে।” তিনি যোগ করেন, এই ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশীয় ও বিদেশি নৌবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ে, যা ভবিষ্যতে যৌথ মহাসাগরীয় নিরাপত্তা উদ্যোগের ভিত্তি হতে পারে।
অন্যদিকে, স্থানীয় মৎস্যজীবী সংস্থাগুলোও এই বিজ্ঞপ্তির প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, মিসাইল ড্রিলের সময় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে মাছ ধরা চালিয়ে যাবে এবং নৌবাহিনীর নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলবে। এই সহযোগিতা নৌবাহিনীর সঙ্গে মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে পারে।
বাণিজ্যিক নৌযান পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোও পূর্বেই রুট পরিবর্তন ও বিকল্প পথ নির্ধারণের পরিকল্পনা করেছে। তারা জানিয়েছে, ড্রিলের সময় কক্সবাজার‑হাতিয়ার রুটে প্রবেশ না করে বিকল্প সমুদ্র পথ ব্যবহার করা হবে, যাতে কোনো অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব না হয়।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই ড্রিলকে বাংলাদেশের সামুদ্রিক কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্লেষণ করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা সংরক্ষণ ও বহুপাক্ষিক নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, যা তার আঞ্চলিক প্রভাবকে শক্তিশালী করবে।
ড্রিলের পরবর্তী পর্যায়ে নৌবাহিনী একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশের পরিকল্পনা করেছে, যেখানে ব্যবহৃত মিসাইলের ধরণ, ফায়ারিং দূরত্ব এবং নিরাপত্তা মূল্যায়ন অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই তথ্যগুলো ভবিষ্যৎ অনুশীলনের জন্য রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে শেয়ার করা হবে।
সামগ্রিকভাবে, ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত মিসাইল ফায়ারিং ড্রিলটি বাংলাদেশের নৌবাহিনীর প্রস্তুতি ও সমুদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আইএসপিআরের সতর্কতা ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সহযোগিতা মিলিয়ে এই কার্যক্রমটি নিরাপদে সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা উচ্চ। ভবিষ্যতে সমুদ্র নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে আরও সমন্বিত অনুশীলন প্রত্যাশিত।



