ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই যোদ্ধা শহীদ ওসমান হাদি গত সপ্তাহে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তার মৃত্যুর ছয় দিন পর ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে ডেকে তদন্তের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবি জানায়।
হাদির মৃত্যু ১৭ ডিসেম্বর ঢাকার এক এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর গুলিতে ঘটেছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সূত্রগুলো জানায়, গুলিবিদ্ধের সঙ্গে একাধিক ব্যক্তি আহত হয়। হাদির মৃত্যু দেশীয় নিরাপত্তা গোষ্ঠীর মধ্যে বিশাল শক সৃষ্টি করে এবং প্রতিবাদে উত্তেজনা বাড়ায়।
ভারত সরকার ২৪ ডিসেম্বর রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করে, হাদির হত্যাকাণ্ডের তদন্তে কোনো পক্ষপাত না রেখে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান চালানোর জন্য বাংলাদেশকে আহ্বান জানায়। মন্ত্রণালয় উল্লেখ করে, হাদির মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা থাকলে তা উন্মোচন করা জরুরি।
পিটিআই সূত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভারত সরকার হাদির হত্যায় নিজস্ব কোনো সংযোগের ইঙ্গিত পায় এবং তাই বিষয়টি নিয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। সরকার দাবি করে, তদন্তের ফলাফল উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
হাদির মৃত্যুর পর ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের সামনে প্রতিবাদী কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণকারীরা ভারতবিরোধী স্লোগান ও ম্যান্ডেট তুলে ধরে, হাদির মৃত্যুকে ভারতীয় নীতির ফলাফল হিসেবে উপস্থাপন করে। এই প্রতিবাদে দেশের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাবের তীব্রতা বাড়ে।
এর আগে, ২৩ ডিসেম্বর ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা নিজ দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বারা তলব হন। তলবের মূল কারণ ছিল দিল্লি ও শিলিগুড়িতে বাংলাদেশি কূটনৈতিক স্থাপনার ওপর আক্রমণ ও ধ্বংসের ঘটনা, যা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের গভীর উদ্বেগের বিষয় ছিল।
মন্ত্রণালয় একই সময়ে ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থানরত বাংলাদেশি কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে উল্লেখ করে। আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে, উভয় দেশের কূটনৈতিক কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ডিসেম্বরের প্রথম দিকে, ১৪ তারিখে প্রণয় ভার্মা আবার তলবের মুখে পড়েন। তলবের পেছনে ছিল শীঘ্রই পদত্যাগ করা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উসকানিমূলক মন্তব্যের অভিযোগ, যা ভারতীয় সরকারকে অস্বস্তিকর করে তুলেছিল। এই ঘটনা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিলতা প্রকাশ করে।
ভারত সরকার হাদির হত্যার সঙ্গে যুক্ত সন্দেহভাজনদের ভারতীয় সীমান্তে পা রাখার সম্ভাবনা রোধে বাংলাদেশকে সহযোগিতা চায়। এ ধরনের সহযোগিতা উভয় দেশের নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বয় ও তথ্য শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে সম্ভব হবে বলে মন্ত্রণালয় উল্লেখ করে।
ডিসেম্বরের ১৭ তারিখে আবার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করা হয়, যা হাদির মামলায় ভারতের ধারাবাহিক জোরের প্রতিফলন। তলবের মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টির প্রতি তাদের তীব্র মনোযোগ ও ত্বরিত সমাধানের ইচ্ছা প্রকাশ করে।
সামগ্রিকভাবে, হাদির হত্যাকাণ্ডের পরপরই দুই দেশের কূটনৈতিক স্তরে একাধিক তলব ও আহ্বান জানানো হয়েছে। উভয় পক্ষই তদন্তের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং সংশ্লিষ্ট সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত তদন্তের পদ্ধতি ও সময়সূচি প্রকাশ করেনি, তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন ও ফলাফল প্রকাশের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তদন্তে কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া গেলে তা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মোকাবেলা করা হবে।
এই ঘটনায় উভয় দেশের কূটনৈতিক সংযোগের উপর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, হাদির পরিবার ও সমর্থকগণ ন্যায়বিচার ও দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়ে চলেছেন। ভবিষ্যতে তদন্তের অগ্রগতি ও ফলাফল উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



