দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে অবস্থিত উম্মাল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার দুটো কক্ষের পাশের দেয়াল ভেঙে ধ্বংসস্তূপে রূপান্তরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটেছে। ঘটনার সময় সকাল দশটার পরে, মাদ্রাসার পরিচালকের ৩২ বছর বয়সী আল আমিন শেখ উপস্থিত ছিলেন, তবে তিনি আহত স্ত্রী ও দুই সন্তানকে ফেলে দ্রুত পলায়ন করেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ জানায়, বিস্ফোরণের ফলে পরিচালকের স্ত্রী আছিয়া বেগম (২৮) এবং দুই সন্তান—উমায়ের (১০) ও আব্দুল্লাহ (৭)—গুরুতর আঘাত পেয়েছেন।
বিস্ফোরণের ফলে দুটো কক্ষের পার্শ্বিক গঠন ধসে পড়ে, ধ্বংসাবশেষের মধ্যে গৃহস্থালির সামগ্রী ও শিক্ষামূলক উপকরণ ছড়িয়ে পড়ে। আহতদের মধ্যে উমায়েরের দেহে পোড়া চিহ্ন এবং ধসের ফলে সৃষ্ট আঘাতের চিহ্ন স্পষ্টভাবে দেখা যায়। আহতদের অবিলম্বে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয় এবং পরে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে স্থানান্তর করা হয়।
তদন্তকারী দল মাদ্রাসা থেকে প্রায় ৪০০ লিটারের বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ উদ্ধার করেছে। কিছু কন্টেইনারে স্পষ্টভাবে “হাইড্রোজেন পার অক্সাইড” লেখা ছিল, আর অন্যান্য কন্টেইনারে বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে এমন রসায়নীয় পদার্থের লেবেল পাওয়া গিয়েছে। পুলিশ এই পদার্থগুলোকে অপ্রতিবন্ধিত বিক্রিয়ার সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা বিস্ফোরণের মূল কারণ হতে পারে বলে প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশের মতে, এই রাসায়নিক ও বিস্ফোরক পদার্থের অনিয়ন্ত্রিত সংমিশ্রণই মাদ্রাসার কাঠামোকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে, মাদ্রাসার পরিচালকের স্ত্রীসহ তিনজন নারীর ওপর গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের মধ্যে আছিয়া বেগম, তার ভাই হারুনুর রশিদের স্ত্রী ইয়াসমিন আক্তার (৩০), এবং আসমা (৩৪) অন্তর্ভুক্ত। হারুনুর রশিদ, যিনি ২০২২ সালে মাদ্রাসা পরিচালনার জন্য একতলা বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন, বর্তমানে দেশে নেই বলে জানা যায়।
আল আমিন শেখের বিরুদ্ধে সাতটি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তিনি পূর্বে দুইবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ২৯ জুলাই ফতুল্লা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা দায়ের হয়েছিল, যেখানে তাকে “নব্য জেএমবি” নামে পরিচিত উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে, বর্তমান বিস্ফোরণ মামলায় তার উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সংযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি।
পুলিশের সূত্রে, আল আমিনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর বিশদ তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি, তবে তিনি পূর্বে বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িত ছিলেন বলে জানা যায়। বর্তমানে, বিস্ফোরণ ঘটনার তদন্ত চলমান এবং সংশ্লিষ্ট সকল প্রমাণ সংগ্রহের কাজ দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে।
বিস্ফোরণ ঘটনার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আসন্ন আদালত শুনানিতে আল আমিনের বিরুদ্ধে দায়ের করা সাতটি মামলার পাশাপাশি বর্তমান বিস্ফোরণ মামলায়ও তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তদন্তকারী দল প্রমাণের ভিত্তিতে অতিরিক্ত অভিযোগ আনা হলে, তা সংশ্লিষ্ট আদালতে দায়ের করা হবে।
এই ঘটনার পর, স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগের স্রোত দেখা যাচ্ছে। তবে, কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ ও তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে। ভবিষ্যতে মাদ্রাসা ও অনুরূপ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তা মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করা এবং রাসায়নিক পদার্থের সংরক্ষণে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা অপরিহার্য বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন।
বিস্ফোরণ ঘটনার পর, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন একত্রে ঘটনাস্থল পরিষ্কার করে পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। পুনর্নির্মাণের সময় শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে এবং আহত পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে। তদন্তের ফলাফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে, সংশ্লিষ্ট সকলকে আইনি দায়িত্বের আওতায় আনা হবে।



