গত দশকের বেশি সময়ে এথিওপিয়া, গ্রিস, হাঙ্গেরি, ভারত, মেক্সিকো, পোল্যান্ড, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে সরকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থা উন্নত স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী এবং বিরোধী গোষ্ঠীর সদস্যদের ফোন ও কম্পিউটার হ্যাক করেছে। এসব হ্যাকিংয়ের ফলে অনেকেই হুমকি, হয়রানি এবং কখনো কখনো শারীরিক হিংসা, এমনকি হত্যার শিকার হয়েছে।
এই ধরনের লক্ষ্যভিত্তিক সাইবার আক্রমণকে “মার্সিনারি স্পাইওয়্যার” বলা হয়, যা মূলত বাণিজ্যিক কোম্পানি থেকে ক্রয় করা হয় এবং রাষ্ট্রের অনুমোদনে ব্যবহার করা হয়। NSO গ্রুপ, Intellexa এবং Paragon হল এমন কিছু কোম্পানি, যাদের পণ্যগুলোকে বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা সংস্থা ব্যবহার করে।
এ ধরনের হুমকির মুখে থাকা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়কে রক্ষা করার জন্য নিউ ইয়র্কে সদর দপ্তরযুক্ত অলাভজনক সংস্থা Access Now একটি ডিজিটাল নিরাপত্তা হেল্পলাইন চালু করেছে। এই হেল্পলাইনটি বিশেষভাবে সাংবাদিক, মানবাধিকার রক্ষাকারী এবং রাজনৈতিক বিরোধী ব্যক্তিদের জন্য ২৪ ঘন্টা সেবা প্রদান করে, যাতে তারা সন্দেহজনক হ্যাকিং ঘটনার সময় দ্রুত সহায়তা পেতে পারে।
হেল্পলাইনের মূল কর্মী দলটি প্রায় এক ডজন ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ নিয়ে গঠিত, যারা কোস্টা রিকা, ম্যানিলা, টিউনিশিয়া এবং অন্যান্য দেশে অবস্থান করে। এই দলটি প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, ডিভাইসের নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় পরিষ্কারের কাজ করে থাকে।
দলটির প্রধান লক্ষ্য হল সন্দেহজনক স্পাইওয়্যার সংক্রমণ ঘটলে তা দ্রুত শনাক্ত করা এবং ব্যবহারকারীকে সঠিক পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেওয়া। এতে ডিভাইসের ফার্মওয়্যার আপডেট, সন্দেহজনক অ্যাপ্লিকেশন মুছে ফেলা এবং নিরাপদ যোগাযোগের বিকল্প প্রদান অন্তর্ভুক্ত।
হেল্পলাইন টিমের ঘটনা প্রতিক্রিয়া বিভাগে হাসেন সেলমি নেতৃত্ব দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে দলটি সবসময় প্রস্তুত থাকে, যাতে কোনো সাইবার নিরাপত্তা ঘটনার সময় ব্যবহারকারী তৎক্ষণাৎ সহায়তা পেতে পারে।
টরন্টোর সিটিজেন ল্যাবের সিনিয়র গবেষক বিল মার্জ্যাক, যিনি প্রায় পনেরো বছর ধরে স্পাইওয়্যার গবেষণায় যুক্ত, Access Now-এর হেল্পলাইনকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের জন্য “সামনের সারির সম্পদ” বলে মূল্যায়ন করেন। তিনি বলেন, এই সেবা সরাসরি ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছায় এবং তাদের সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অ্যাপল কোম্পানি যখন ব্যবহারকারীদের জানায় যে তাদের ডিভাইস মার্সিনারি স্পাইওয়্যার দ্বারা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে, তখন তারা প্রায়ই Access Now-কে রেফার করে। এই ধরনের “থ্রেট নোটিফিকেশন” ব্যবহারকারীকে সতর্ক করে এবং একই সঙ্গে হেল্পলাইনকে সমস্যার মূল সমাধানকারী হিসেবে উপস্থাপন করে।
একটি সাধারণ পরিস্থিতি হল, কোনো ব্যবহারকারী অ্যাপল থেকে সতর্কতা পায় যে তার ফোনে সন্দেহজনক স্পাইওয়্যার রয়েছে। তখন হেল্পলাইন টিম দ্রুত ব্যবহারকারীকে কল করে, নোটিফিকেশনের অর্থ ব্যাখ্যা করে এবং পরবর্তী পদক্ষেপের নির্দেশনা দেয়। এতে ডিভাইসের লগ বিশ্লেষণ, সম্ভাব্য ক্ষতিকারক কোডের সনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় পরিষ্কারের কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকে।
এই সেবার ফলে ভুক্তভোগীরা প্রযুক্তিগত জটিলতা থেকে মুক্তি পেয়ে দ্রুত তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে সাংবাদিকরা, যারা সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের সময় নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুখীন, তাদের জন্য এই সেবা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা হেল্পলাইন শুধু প্রযুক্তিগত সহায়তা নয়, এটি মানবাধিকার ও সংবাদস্বাধীনতার রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সরকারী হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন সেবার চাহিদা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে, স্পাইওয়্যার প্রযুক্তি আরও উন্নত ও গোপনীয় হয়ে উঠার সম্ভাবনা রয়েছে, ফলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কাজের পরিধি বিস্তৃত হবে। Access Now এবং অনুরূপ সংস্থাগুলোকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও সম্পদ ও আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন, যাতে ডিজিটাল জগতে স্বাধীনতা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা যায়।



