জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এর কেন্দ্রীয় কমিটির ত্রিশজন সদস্য শনিবার নাহিদ ইসলামকে চিঠি লিখে জামায়াত‑ই‑ইসলাম ও তার ছাত্র সংগঠন শিবিরের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক জোটের সম্ভাবনা নিয়ে কঠোর আপত্তি জানিয়েছেন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই জোটের আলোচনা দেশের রাজনৈতিক নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ।
চিঠি এনসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিনিধিদের স্বাক্ষরে প্রস্তুত করা হয় এবং প্রথম আলোকে দলের যুগ্ম সদস্যসচিব মুশফিক উস সালেহীন নিশ্চিত করেছেন যে, এটি সত্যিকারের দলীয় পদক্ষেপ। তারা নাহিদ ইসলামকে সরাসরি এই উদ্বেগ প্রকাশের মাধ্যমে জোটের কোনো রূপ নিতে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধান কারণ হিসেবে দলীয় নেতারা জামায়াতের ঘোষিত আদর্শ, জুলাই মাসে ঘটিত গণ‑অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত ঐতিহাসিক দায়িত্ব এবং গণতান্ত্রিক নৈতিকতার লঙ্ঘনকে উল্লেখ করেছেন। তারা বলেন, জুলাই ২০২৩‑এর উত্তেজনা ও তার পরবর্তী এক বছরের সময়ে জামায়াতের ছাত্র শিবিরের বিভাজনমূলক কর্মকাণ্ড দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্ট করেছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, জামায়াতের বিভিন্ন দলীয় গোষ্ঠীর মধ্যে গোপনীয় তথ্য সংগ্রহ, স্যাবোটেজ এবং এনসিপির ওপর অপরাধের দায় চাপানোর প্রচেষ্টা চলেছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের সমর্থিত সংগঠনগুলো বাগছাস ও পরবর্তীতে ছাত্রশক্তি সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে বিকৃত করার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে জামায়াতের ফোর্সের মাধ্যমে এনসিপি ও তার ছাত্র সংগঠনের নারী সদস্যদের চরিত্রহানির প্রচেষ্টা, এবং ধর্মকে কেন্দ্র করে সামাজিক ফ্যাসিবাদের উত্থানের আশঙ্কা দলীয় নেতাদের উদ্বেগের মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই সব বিষয়কে একত্রে দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
জামায়াতের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ভূমিকা, স্বাধীনতাবিরোধী কার্যক্রম, গণহত্যায় সহযোগিতা এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধে তাদের অবস্থানকে এনসিপির গণতান্ত্রিক চেতনা ও দলের মূল মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে বিরোধপূর্ণ বলে দলীয় নেতারা উল্লেখ করেছেন। তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, ঐতিহাসিক দায়িত্বের আলোকে জামায়াতের সঙ্গে কোনো জোট এনসিপির নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করবে।
দলীয় নেতারা জোটের ফলে এনসিপির রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। পূর্বে নাহিদ ইসলাম ও প্রধান সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী একাধিকবার ৩০০ আসনের জন্য স্বতন্ত্রভাবে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে প্রায় এক হাজার পাঁচশোটি মনোনয়নপত্র বিক্রি করে ১২৫ জন প্রার্থী নির্ধারণের কথা জানিয়েছিলেন।
এখন মাত্র কয়েকটি আসনের জন্য কোনো জোটে অংশগ্রহণকে দলীয় নেতারা দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রতারণার সমতুল্য বলে বিবেচনা করছেন। তারা উল্লেখ করেছেন যে, স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং বৃহৎ সংখ্যক প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত করা এনসিপির স্বতন্ত্রতা ও স্বচ্ছতার প্রতীক ছিল, যা এখন ক্ষুণ্ন হতে পারে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে যে, যখনই জোটের সম্ভাবনা নিয়ে মিডিয়ায় খবর প্রকাশ পায়, তখনই এনসিপি তৎক্ষণাৎ সতর্কতা প্রকাশ করে এবং এই ধরনের আলোচনা বন্ধ করার আহ্বান জানায়। দলীয় নেতারা ভবিষ্যতে এমন কোনো আলোচনা পুনরাবৃত্তি না হওয়ার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
অবশেষে, এনসিপি এই চিঠির মাধ্যমে স্পষ্ট করেছে যে, তারা স্বাধীনভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে এবং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জামায়াতের সঙ্গে কোনো জোটের সম্ভাবনা এখনো না থাকলে, দলীয় নেতৃত্ব স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরিকল্পনা অব্যাহত রাখবে।



