গাজা শহর – ৫২ বছর বয়সী ডাক্তারের হুসাম আবু সাফিয়া, যিনি গাজা শহরের উত্তরে বেইত লাহিয়ার কামাল আদওয়ান হাসপাতালের পরিচালক, এক বছর আগে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা গ্রেফতার হন এবং এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই জেলখানায় রয়েছেন। তার পরিবার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো তার অবনতি হওয়া স্বাস্থ্যের উদ্বেগ প্রকাশ করে মুক্তির দাবি জানাচ্ছে।
হুসাম আবু সাফিয়া গাজা অঞ্চলের সবচেয়ে ব্যস্ত হাসপাতালের একজন প্রধান চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ইসরায়েলি বোমা হামলার পরেও তিনি এবং তার সহকর্মীরা হাসপাতালের দরজা বন্ধ না করে রোগীদের সেবা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আক্রমণ হাসপাতালের চারপাশে ঘেরাও গড়ে তোলে এবং কর্মীদের বের করে দিতে বাধ্য করে। সেই মুহূর্ত থেকে হুসামকে বিভিন্ন জেলখানায় স্থানান্তর করা হয়, প্রথমে সেদে তেইমান নামে পরিচিত জেলখানায় এবং পরে ওফার কারাগারে।
হুসামকে “অবৈধ যোদ্ধা” (unlawful combatant) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা ইসরায়েলি আইন অনুযায়ী অপরাধের প্রমাণ না দেখিয়ে দীর্ঘমেয়াদী আটক অনুমোদন করে এবং আটককারীর বিরুদ্ধে প্রমাণের অ্যাক্সেস সীমিত করে। এই ধারা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে বিতর্কিত, কারণ জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী চিকিৎসক ও হাসপাতালের কর্মীকে সশস্ত্র সংঘাতে নিরপেক্ষ সেবা প্রদানকারী হিসেবে রক্ষা করা উচিত।
হুসামের স্বাস্থ্যের অবস্থা দ্রুত খারাপ হচ্ছে বলে তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন। তিনি জেলখানায় তার দেহের ওজনের এক তৃতীয়াংশের বেশি হারিয়েছেন এবং হৃদরোগ, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, উচ্চ রক্তচাপ, ত্বকের সংক্রমণসহ গুরুতর শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন। বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধার অভাবে তার অবস্থা আরও অবনতি করছে।
হুসামের পরিবার এক মাস আগে কাজাশস্থানে গিয়ে নিরাপত্তা খোঁজার জন্য কাজাশে আশ্রয় নিয়েছে। তার বড় ছেলে ইলিয়াস, ২৭ বছর বয়সী, কাজাশের একটি শহরে জুমের মাধ্যমে তার পিতার অবস্থার বিষয়ে জানিয়েছেন যে পিতার একমাত্র “অপরাধ” হল ডাক্তার হওয়া। ইলিয়াসের মা আলবিনা কাজাশের নাগরিক এবং পরিবারের বাকি চারজন সন্তানও তার সঙ্গে গাজা থেকে পালিয়ে এসেছে।
ইসরায়েলি আক্রমণের সময়, ২৬ অক্টোবর ২০২৪-এ, হুসামের ছোট ভাই ইব্রাহিম, ২০ বছর বয়সী, হাসপাতালের আশেপাশে শেলিংয়ের ফলে নিহত হন। ইলিয়াসের মতে, পুরো চিকিৎসা কর্মী দলই তাদের পিতার এবং ইব্রাহিমের জন্য শোক প্রকাশ করেছে। এই ঘটনা গাজা অঞ্চলে চিকিৎসা কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগকে তীব্র করে তুলেছে।
ইউএন মানবাধিকার কাউন্সিল এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রস (ICRC) উভয়ই গাজা অঞ্চলে চিকিৎসা কর্মীদের উপর আক্রমণকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে। এক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, “চিকিৎসককে অপরাধী হিসেবে গণ্য করে দীর্ঘমেয়াদী আটক করা আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এটি সংঘাতের মানবিক দিককে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে।” ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার প্রতিনিধি একইভাবে ইসরায়েলকে হুসাম আবু সাফিয়ার অবস্থা সম্পর্কে স্বচ্ছতা প্রদান এবং দ্রুত মুক্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইসরায়েল সরকার এখনও হুসামের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ প্রকাশ করেনি এবং তাকে “অবৈধ যোদ্ধা” হিসেবে ধরে রাখার কারণ ব্যাখ্যা করেনি। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা জোর দিয়ে বলছেন, গাজা অঞ্চলে চিকিৎসা কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতে আরও মানবিক সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।
অধিকন্তু, গাজা অঞ্চলের হাসপাতালগুলো বর্তমানে কার্যহীন অবস্থায় রয়েছে, যা রোগী ও বেসামরিক জনগণের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যসেবা সংকটের সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মানবিক সাহায্য গোষ্ঠী গাজা অঞ্চলে জরুরি চিকিৎসা সরবরাহের জন্য দিকনির্দেশনা দিচ্ছে, তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত।
হুসাম আবু সাফিয়ার অবস্থা এবং গাজা হাসপাতালের বন্ধ হওয়া বিষয়টি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কূটনীতিকের মতে, ইসরায়েলকে গাজা অঞ্চলে চিকিৎসা কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ড মেনে চলা উচিত। একই সঙ্গে, আরব লিগের প্রতিনিধিরা ইসরায়েলকে গাজা অঞ্চলে মানবিক সাহায্য প্রবাহে বাধা না দেওয়ার এবং চিকিৎসা কর্মীদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
হুসাম আবু সাফিয়ার মুক্তি এবং গাজা হাসপাতালের পুনরায় চালু হওয়া আগামী কয়েক মাসের কূটনৈতিক মাইলস্টোন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও স্বচ্ছতা প্রত্যাশা করা হচ্ছে। গাজা অঞ্চলের রোগী ও পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা পুনরুদ্ধার এবং চিকিৎসা কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানবিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার আলোকে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।



