জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলি নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পার্ষদের কার্যনির্বাহী সচিব মনিন্দ্র কুমার নাথের মতে, ভোটদান প্রক্রিয়ায় যথাযথ সুরক্ষা না পেলে এই গোষ্ঠীগুলি ভোটের জন্য ভোটকেন্দ্রে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে পারে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনের সময় প্রার্থীকে সমর্থন বা বিরোধিতা করার ভিত্তিতে হুমকি, আক্রমণ এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হন। নাথ উল্লেখ করেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ব্যর্থতা ভোটার অংশগ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ঢাকার সিআইআরডিএপি অডিটোরিয়ামে “সংখ্যালঘু মানবাধিকার – বর্তমান বাস্তবতা ও প্রত্যাশা” শীর্ষক রাউন্ডটেবিলের সময় নাথ একটি ধারণা পত্র উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে আচরণবিধি লঙ্ঘন করছে এবং এই বিষয়টি বিভিন্ন দল ও সংগঠনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
রাউন্ডটেবিলের আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে দেশজুড়ে সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলি ধর্মীয় সহিংসতার শিকার হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২,১৮৪টি এবং ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ৪৮৯টি সহিংসতা ঘটেছে, যা মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে রিপোর্ট হয়েছে।
ডিসেম্বরে মাত্র পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এই সংখ্যার মধ্যে সবচেয়ে নৃশংস ঘটনা হিসেবে ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্মীয় অপরাধের অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাসের নির্মম হত্যাকাণ্ড উল্লেখযোগ্য। দাসের দেহ গাছের ডালে ঝুলিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
নাথ দাবি করেন, আগস্ট ৫ পরবর্তী সহিংসতাকে সরকার “রাজনৈতিক” হিসেবে লেবেল করার প্রচেষ্টা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে গভীরভাবে হতাশ করেছে। যদিও পরে পুলিশ প্রশাসন কিছুটা সত্য স্বীকার করেছে, তবু এই দৃষ্টিভঙ্গি গোষ্ঠীর নিরাপত্তা উদ্বেগকে বাড়িয়ে তুলেছে।
রাউন্ডটেবিলের অংশগ্রহণকারীরা উল্লেখ করেছেন, নির্বাচনের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সংখ্যালঘু ভোটাররা ভোটদানের প্রক্রিয়া থেকে সরে যেতে পারে, যা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মৌলিক নীতিকে ক্ষুণ্ণ করবে। এই উদ্বেগের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনও নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে।
প্রতিবেদনটি উল্লেখ করে যে, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ ও হয়রানির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভোটদানের ইচ্ছা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ব্যবহার করে রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্রে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে সবাই একমত।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে, নিরাপত্তা সংক্রান্ত এই উদ্বেগ নির্বাচন ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। যদি সরকার ও নির্বাচন কমিশন যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়, তবে সংখ্যালঘু ভোটারদের অংশগ্রহণ হ্রাস পেতে পারে, যা নির্বাচনের বৈধতা ও অন্তর্ভুক্তি প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
অধিকন্তু, রাউন্ডটেবিলের শেষে অংশগ্রহণকারীরা নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য নির্দিষ্ট সুপারিশ উপস্থাপন করেছেন, যার মধ্যে ভোটকেন্দ্রের আশেপাশে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো, হুমকি ও হয়রানির বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গঠন এবং সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুরক্ষা পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত।
এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোটদানের ইচ্ছা পুনরুদ্ধার হতে পারে এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা বাড়বে। তবে এখনো পর্যন্ত সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো পদক্ষেপের ঘোষণা পাওয়া যায়নি, যা নির্বাচনের পূর্বে নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ভোটদানের হার হ্রাস পেতে পারে, ফলে নির্বাচনের ফলাফলও প্রভাবিত হতে পারে। রাউন্ডটেবিলের আলোচনায় উত্থাপিত বিষয়গুলো সরকারী নীতি গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে।



