কিয়েভে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের রাতারাতি আক্রমণের পর পোল্যান্ডের সীমানা পার হয়ে তার বিমানবাহিনীর জেটগুলো তৎক্ষণাৎ চালু করা হয়েছে। পোল্যান্ডের সামরিক বাহিনী এ পদক্ষেপকে “প্রতিরোধমূলক” বলে airspace সুরক্ষার উদ্দেশ্য উল্লেখ করেছে। কিয়েভে একজন নিহত এবং ২৮ জন আহত হওয়ার তথ্য ইউক্রেনের স্টেট ইমারজেন্সি সার্ভিস জানিয়েছে।
আক্রমণের ফলে শহরের বহু আবাসিক ভবনে গর্ত ও অগ্নিকাণ্ড দেখা গেছে, যা রাতের অন্ধকারে শহরের দৃশ্যকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। ইউক্রেনের মেয়র ভিটালি ক্লিচকো উল্লেখ করেন, হাজার হাজার বাড়ির বিদ্যুৎ কেটে গেছে এবং তাপ সরবরাহে বড় ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যখন তাপমাত্রা শূন্যের নিচে নেমে এসেছে।
ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির জেলেনস্কি আগামী রবিবার ফ্লোরিডায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক রাশিয়ান আক্রমণের পর জেলেনস্কি পুনরায় জোর দিয়ে বলেছেন, রাশিয়া যুদ্ধ শেষ করতে চায় না এবং ইউক্রেনের ওপর আরও কষ্ট আরোপের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
টেলিগ্রাম চ্যানেলে জেলেনস্কি উল্লেখ করেন, রাশিয়া প্রায় ৫০০টি ড্রোন এবং ৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র কিয়েভের দিকে পাঠিয়েছে, যেগুলো প্রধানত শক্তি সরবরাহ ও নাগরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করেছে। তিনি বলেন, এই ধরনের আক্রমণ রাশিয়ার যুদ্ধের কৌশলকে প্রকাশ করে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন।
আক্রমণের ফলে ডার্নিত্স্কি জেলায় অবস্থিত একটি বয়স্ক আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ৬৮ জন বাসিন্দা নিরাপদে স্থানান্তরিত হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্ধার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং আহতদের জন্য চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
জেলেনস্কি টেলিগ্রামে রাশিয়ার প্রতিনিধিদের দীর্ঘ আলোচনা করার তুলনায় “ড্যাগার” (ক্ষেপণাস্ত্র) এবং “শাহেদ” (ড্রোন) তাদের প্রকৃত ইচ্ছা প্রকাশ করে বলে উল্লেখ করেন। তিনি যুক্তি দেন, ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধ শেষ করার কোনো ইচ্ছা রাখেন না এবং এই অব্যাহত আগ্রাসনকে থামাতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের দৃঢ় পদক্ষেপ প্রয়োজন।
পোল্যান্ডের সীমান্ত ৫৩০ কিলোমিটার (৩২০ মাইল) দীর্ঘ, যা ইউক্রেনের পশ্চিম অংশের সঙ্গে সংযুক্ত। এই সীমান্তে পোল্যান্ডের বিমানবাহিনী জেট, স্থলভিত্তিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং রাডার পর্যবেক্ষণ ইউনিট সক্রিয় করেছে। লক্ষ্য হল সীমান্তের নিকটবর্তী আকাশকে রাশিয়ান হুমকি থেকে রক্ষা করা।
পোল্যান্ডের এই পদক্ষেপকে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অ্যান্টনি ভাসিলেভ মন্তব্য করেন, “পোল্যান্ডের দ্রুত প্রতিক্রিয়া ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা রাশিয়ার আক্রমণাত্মক নীতি মোকাবেলায় সমন্বিত রক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে।” তিনি আরও যোগ করেন, এই ধরনের সমন্বয় না থাকলে আঞ্চলিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে পারে।
ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং তাপের অভাবের কারণে শীতল আবহাওয়ায় নাগরিকদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার জরুরি তাপ সরবরাহের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা চালু করেছে, তবে অবকাঠামো ক্ষতির পরিমাণ এখনও পূর্ণভাবে নির্ধারিত হয়নি।
রাশিয়ার আক্রমণ এবং পোল্যান্ডের প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ন্যাটো সদস্য দেশগুলো ইতিমধ্যে পোল্যান্ডের এয়ার ডিফেন্সে অতিরিক্ত সহায়তা প্রদান করার কথা জানিয়েছে, যা রাশিয়ার সম্ভাব্য অতিরিক্ত আক্রমণকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
ইউক্রেনের শান্তি আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক চালচলনও তীব্রতর হচ্ছে। বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, যদি রাশিয়া এই ধরনের আক্রমণ চালিয়ে যায়, তবে ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক সহায়তা বাড়তে পারে।
পরবর্তী সপ্তাহে পোল্যান্ড এবং ন্যাটো সদস্য দেশগুলো কীভাবে তাদের সীমানা রক্ষা করবে এবং রাশিয়ার আক্রমণাত্মক নীতি কীভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়ায় পরিবর্তিত হবে, তা পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতি ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতের নতুন পর্যায়ের সূচনা নির্দেশ করে, যেখানে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সমঝোতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



