মরক্কো, আফ্রিকান ফুটবলের প্রধান মঞ্চ হিসেবে ২০২৪ সালের আফ্রিকান নেশনস কাপ (AFCON) আয়োজনের সঙ্গে সঙ্গে ২০৩০ সালের পুরুষ বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দশ বছর আগে, ২০১৫ সালের AFCON হোস্টিং থেকে হঠাৎ প্রত্যাহার করার ফলে দেশটি কন্টিনেন্টের মধ্যে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল; তবে আজকের দিনটি সম্পূর্ণ বিপরীত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
২০১৫ সালে, মরক্কোর সরকার ইবোলা ভাইরাসের বিস্তার রোধের আশঙ্কা করে আফ্রিকান নেশনস কাপের আয়োজন থেকে সরে যায়। এই সিদ্ধান্তের ফলে কনফেডারেশন অফ আফ্রিকান ফুটবল (CAF) কে টুর্নামেন্টটি ইকুয়েটোরিয়াল গিনি-তে স্থানান্তর করতে হয়, যেখানে প্রস্তুতির জন্য মাত্র ৯০ দিনের কম সময় ছিল। সেই সময়ে হিশাম এল আমরানি, যিনি CAF‑এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তিনি উল্লেখ করেন যে তিনি একাধিক দিক থেকে চাপে ছিলেন এবং এই ঘটনার স্মৃতি তিনি ভুলে যেতে চান।
মরক্কোর এই প্রত্যাহারকে পরিণত করে দু’টি পরবর্তী AFCON‑এর থেকে নিষেধাজ্ঞা এবং CAF‑এর আর্থিক জরিমানা, যা পরে স্পোর্টস আরবিট্রেশন কোর্টে রদ করা হয়। এই আইনি প্রক্রিয়া এবং নিষেধাজ্ঞা শেষ পর্যন্ত মরক্কোর ফুটবল প্রশাসনের জন্য একটি শিক্ষণীয় মুহূর্তে পরিণত হয়।
এরপর থেকে মরক্কো ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেকে পুনর্গঠন করেছে। ২০২২ এবং ২০২৩ সালে নারী AFCON সফলভাবে আয়োজনের পর, ২০২৪ সালে পুরুষ AFCON‑এর হোস্টিং সম্পন্ন করেছে। এছাড়া ২০২৬ সালের মার্চ‑এপ্রিল মাসে আরেকটি নারী AFCON আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা দেশটির অবকাঠামো ও সংগঠন ক্ষমতার ধারাবাহিক উন্নয়নের সূচক।
মরক্কোর ফুটবল জগতের বিশ্লেষক আমিন এল আমরি, যিনি লে৩৬০-এ স্পোর্টস প্রধান, জানান যে তিনি নিজের ৪০ বছরের ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপের বহু ব্যর্থ বিডের সাক্ষী হয়েছেন। তিনি যুক্তি দেন যে বিশ্বকাপের আয়োজন একটি জাতীয় স্বপ্ন, যা সমাজের তরুণ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী অংশকে একত্রিত করে। যদিও এমন বড় ইভেন্টের জন্য ব্যয়বহুল বিনিয়োগের প্রয়োজন, তবে তা অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিতে সহায়তা করে।
রয়্যাল মরক্কো ফুটবল ফেডারেশন (FRMF)‑এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রধান ওমর খ্যারি উল্লেখ করেন যে ২০১৫ সালের ঘটনার পর ২০১৭ সালে রাজা মোহাম্মদ ষষ্ঠের উদ্যোগে আফ্রিকান দেশগুলোর সঙ্গে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ় করার নীতি গৃহীত হয়। এই নীতি মরক্কোর ফুটবলকে কন্টিনেন্টের অন্যান্য দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করেছে।
হাসান I বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পোর্টস সোসিওলজি অধ্যাপক আবদেরাহিম বুরকিয়া এই পরিবর্তনকে সমাজবিজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেন; তিনি বলেন যে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ধারাবাহিক আয়োজন দেশকে গ্লোবাল ফুটবলে একটি স্থিতিশীল ও সম্মানজনক অবস্থানে স্থাপন করেছে।
মরক্কোর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও বিশাল। ২০৩০ সালে স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে পুরুষ বিশ্বকাপের আয়োজনের জন্য দেশটি প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে মরক্কো কেবল আফ্রিকান ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দু নয়, বরং ইউরোপীয় ও গ্লোবাল ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
সারসংক্ষেপে, ২০১৫ সালের ইবোলা উদ্বেগের কারণে মরক্কোর হোস্টিং প্রত্যাহার থেকে শুরু করে আজকের দিন পর্যন্ত দেশের ফুটবলের অবস্থান একটি নাটকীয় পরিবর্তন দেখিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক জরিমানা থেকে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ধারাবাহিক আয়োজন, এবং ২০৩০ সালের বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজনের পরিকল্পনা পর্যন্ত, মরক্কো এখন আফ্রিকান ও গ্লোবাল ফুটবলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে স্বীকৃত। এই রূপান্তর দেশটির ক্রীড়া নীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সামাজিক উন্নয়নের সমন্বিত ফলাফল, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ইভেন্টের আয়োজনের ভিত্তি স্থাপন করবে।



